খামারি গাইড · ১৩ অক্টোবর ২০২৬

সাইলেজ দিয়ে TMR: হাতে মিশ্র খাদ্য তৈরির নিয়ম

সাইলেজ এক বেলা, খড় আরেক বেলা, দানাদার দুধ দোয়ানোর সময়: বেশিরভাগ খামারে গরু এভাবেই খায়। TMR মানে সব একসাথে মিশিয়ে দেওয়া, যাতে প্রতিটি মুখে একই খাবার যায়। মেশিন লাগে না, একটা বেলচা আর একটু নিয়ম লাগে। এই গাইডে সেই নিয়ম, আর বাংলাদেশের গবেষণা কী পেয়েছে।

কাছ থেকে ভুট্টা সাইলেজ, খামারভেস্ট সাইলেজ

এক কথায় উত্তর

TMR (টোটাল মিক্সড রেশন) হলো গরুর দিনের পুরো খাবার, মানে আঁশ, দানাদার আর খনিজ, মেপে এক সাথে মিশিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য একটাই: গরু যেন দানাদার বেছে খেয়ে খড় ফেলে রাখতে না পারে, আর রুমেন সারা দিন একই রকম খাবার পায়। সাইলেজ এখানে সবচেয়ে কাজের উপাদান, কারণ এর আর্দ্রতা শুকনা দানাদার আর খড়কে আটকে রাখে। নিয়ম তিনটা: মেপে নিন, খড় ছোট করে কাটুন, প্রতি বেলায় টাটকা মেশান।

১. TMR কী, আর আলাদা খাওয়ানোর সমস্যা কোথায়

আলাদা খাওয়ালে গরু নিজেই বেছে নেয়। দানাদার আগে শেষ হয়, তারপর সবুজ, শেষে খড় পড়ে থাকে। দানাদার এক বেলায় বেশি খেলে রুমেনে হঠাৎ অম্ল বাড়ে, আর খড় ফেলে রাখলে আঁশ কম পড়ে, যা রুমেনের স্বাভাবিক কাজের জন্য দরকার। এই দুটো কারণে সাসকাচোয়ান সরকারের কৃষি বিভাগের TMR নির্দেশিকা বলে, মিশ্রণের লক্ষ্য হলো বেছে খাওয়া কমানো আর সাবএকিউট রুমেন অ্যাসিডোসিস ঠেকানো, যাতে প্রতিটি কামড়ে গরু দরকারি পুষ্টি পায়।

রুমেন কীভাবে কাজ করে আর আঁশ কেন বাদ দেওয়া যায় না, তা বিস্তারিত আছে রুমেনের গাইডে। এখানে শুধু মনে রাখুন: TMR নতুন কোনো খাবার নয়, একই খাবার একটু অন্যভাবে দেওয়া।

২. বাংলাদেশের গবেষণা কী পেয়েছে

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI), সাভারে TMR নিয়ে তিনটা পরীক্ষা হয়েছে। তিনটাই গবেষণা খামারে, অল্প কয়েকটা গরুতে, তাই ফলটা দিক নির্দেশ করে, আপনার খামারের নিশ্চয়তা নয়।

পরীক্ষা TMR-এর গঠন যা পাওয়া গেছে
১৮টি দুধের রেড চিটাগাং গাভী, ৪৫ দিন (২০১৯)আঁশ ৫০ : দানাদার ৫০, প্রোটিন ১৬%, ব্লক ও গুঁড়া দুই রূপেদুধ ব্লক TMR-এ দিনে ৩.৬০ লিটার, গুঁড়া TMR-এ ৩.৪৯, খামারের প্রচলিত পদ্ধতিতে (নেপিয়ার আর আলাদা দানাদার) ৩.৩৫; দুধের চর্বি ও হজমযোগ্যতাও TMR-এ বেশি
১৫টি দুধের রেড চিটাগাং গাভী, ৭০ দিন (২০১৮)ধানের খড়ভিত্তিক, আঁশ ৬০ : দানাদার ৪০TMR দলে দুধ, দুধের উপাদান ও হজমযোগ্যতা প্রচলিত খাওয়ানোর চেয়ে বেশি; শরীরের ওজনে পার্থক্য নেই
৩০টি বাড়ন্ত ষাঁড়, পাঁচ রকম অনুপাত (২০১৮)সাইলেজ ও সয়াবিনের খড়, আঁশ ৭০:৩০ থেকে ৩০:৭০৬০:৪০ অনুপাতে খাদ্য গ্রহণ ও হজম সবচেয়ে বেশি, দৈনিক ওজন বৃদ্ধি ০.৮৬ কেজি; তবে পাঁচ দলের ওজন বৃদ্ধির পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়

তিনটা কথা পরিষ্কার। এক, পার্থক্যটা ছোট: প্রথম পরীক্ষায় দিনে এক লিটারের চার ভাগের এক ভাগের মতো, আর সেখানে শুধু মেশানোর ধরন নয়, রেশনও আলাদা ছিল। দুই, ষাঁড়ের পরীক্ষায় দানাদার অর্ধেকের বেশি করে বাড়তি সুফল দেখা যায়নি, অর্থাৎ আঁশ ৬০, দানাদার ৪০ একটা যুক্তিসঙ্গত শুরু। তিন, এগুলো গবেষণা খামারের মাপা রেশন; আপনার গরুর ফল নির্ভর করবে আপনার উপাদানের মানের উপর।

৩. মিশ্রণে কী থাকবে

  • ভুট্টা সাইলেজ: মূল আঁশ ও শক্তি। দুধের গাভীতে দিনে প্রায় ২০ কেজি, মোটাতাজাকরণে ১৫ কেজি। খামারভেস্ট সাইলেজের মতো দানা-ভরা ভুট্টার সাইলেজে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পানি, আর এই আর্দ্রতাই মিশ্রণকে আঠালো রাখে।
  • শুকনা খড়: দিনে ১-২ কেজি, রুমেনের জন্য লম্বা আঁশ। ছোট করে কেটে নিতে হবে, নইলে গরু খড় আলাদা করে ফেলে রাখবে।
  • দানাদার: প্রোটিন আর বাড়তি শক্তি। দুধের গাভীতে সাধারণ নিয়ম প্রতি ২-৩ লিটার দুধে ১ কেজি; কী দিয়ে বানাবেন তা আছে দানাদারের গাইডে। সাইলেজে প্রোটিন কম, তাই খৈল বাদ দেওয়া যায় না।
  • লবণ ও খনিজ মিশ্রণ: পরিমাণে সবচেয়ে কম, তাই আলাদা দিলে কোনো গরু বেশি পায়, কোনোটা পায় না। TMR-এ মেশালে সবাই সমান পায়। বিস্তারিত খনিজের গাইডে।

৪. হাতে মেশানোর ৫টি ধাপ

বড় খামারে মিক্সার মেশিন থাকে, আর মেশিনের ধরন অনুযায়ী মেশানোর ক্রম আলাদা। সাসকাচোয়ানের নির্দেশিকায় অগার মিক্সারে আগে দানাদার, তারপর সাইলেজ, শেষে শুকনা আঁশ; উল্লম্ব মিক্সারে আগে লম্বা শুকনা আঁশ, শেষে সাইলেজ। ২-১০টি গরুর খামারে কাজটা হাতেই হয়, আর নিচের ক্রমটা সেই নীতি থেকে সাজানো: অল্প পরিমাণের জিনিস আগে বড় কিছুর সাথে মেশানো, ভেজা উপাদান দিয়ে শুকনাকে আটকানো।

  1. ওজন করুন। চোখের আন্দাজে নয়, দাঁড়িপাল্লায়। একটা বালতির ওজন একবার মেপে রাখলে প্রতিদিন আর মাপতে হয় না: "এক বালতি সাইলেজ = এত কেজি"।
  2. খনিজ আগে দানাদারে মেশান। ৩০ গ্রাম খনিজ সরাসরি ২০ কেজি সাইলেজে ছড়ালে সমান হয় না। আগে কয়েক কেজি দানাদারে মেশালে পরে পুরো স্তূপে সমান ছড়ায়।
  3. সাইলেজ বিছিয়ে দানাদার ছিটান। পরিষ্কার পলিথিন বা পাকা মেঝেতে সাইলেজ পাতলা করে বিছিয়ে তার উপর দানাদার ছিটিয়ে দিন। সাইলেজের আর্দ্রতায় গুঁড়া লেগে যায়, ফলে গরু আর আলাদা করে চেটে খেতে পারে না।
  4. কাটা খড় দিয়ে উল্টে-পাল্টে মেশান। বেলচা দিয়ে কয়েকবার উল্টে দিন, যতক্ষণ না কোথাও আলাদা রঙের স্তূপ চোখে পড়ে। মেশিনেও শেষ উপাদানের পর ৩-৫ মিনিটই যথেষ্ট বলা হয়, আর বেশি মেশালে আঁশ ভেঙে গুঁড়া হয়, যা রুমেনের জন্য দরকারি কার্যকর আঁশ কমিয়ে দেয়।
  5. সাথে সাথে খাওয়ান, তারপর নাঁদ দেখুন। প্রতি বেলার জন্য আলাদা মেশান। খাওয়ার পর যা পড়ে থাকে তা দেখুন: যদি বেশিরভাগই লম্বা খড়, তাহলে গরু বেছে খাচ্ছে, খড় আরও ছোট করে কাটুন।

৫. খড় কত ছোট, মিশ্রণ কত ভেজা

পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টিকেল সেপারেটর নামে তিন তলার একটা চালনি দিয়ে খামারে TMR-এর আঁশের দৈর্ঘ্য মাপা হয়। তাদের নির্দেশনা:

চালনির স্তর দুধের গাভীর TMR শুকনা গাভীর TMR ভুট্টা সাইলেজ একা
উপরে (প্রায় ১৯ মিমির চেয়ে লম্বা)৬-১০%১০-২০%৫-১০%
মাঝে (প্রায় ৮-১৯ মিমি)৪৫-৫৫%৫০-৬০%৪৫-৬৫%
নিচে (৮ মিমির ছোট)৫০% এর কম৪০% এর কম৩০-৪০%

সহজ ভাষায়: লম্বা টুকরো অল্প, বেশিরভাগ আঙুলের এক-দুই কড়ের মাপের। চালনি না থাকলে নাঁদের উচ্ছিষ্টই আপনার মাপকাঠি, যেমন ধাপ ৫-এ বলা হয়েছে। আর আর্দ্রতা: নির্দেশিকা বলে, TMR-এর শুকনা অংশ ৫৫ শতাংশ ছাড়ালে পানি মেশালে বেছে খাওয়া কমে। শুধু খড় আর দানাদারের মিশ্রণে এটা দরকার হয়; সাইলেজ থাকলে সাধারণত হয় না, কারণ নিচের উদাহরণের মিশ্রণে শুকনা অংশ প্রায় ৪৪ শতাংশ।

৬. একটা গাভীর উদাহরণ

৪০০ কেজির একটা গাভী, দিনে ১০ লিটার দুধ। নিচের পরিমাণগুলো এই সাইটের অন্য গাইডের সাধারণ নিয়ম থেকে নেওয়া; আপনার গাভীর সঠিক রেশন বের করতে রেশন জেনারেটরে নিজের খাবার আর দর বসান।

উপাদান দিনে প্রতি বেলায় (দুই বেলা)
ভুট্টা সাইলেজ২০ কেজি১০ কেজি
কাটা ধানের খড়১.৫ কেজি৭৫০ গ্রাম
দানাদার (শক্তি ৩ : প্রোটিন ২)৪ কেজি২ কেজি
লবণ ও খনিজ মিশ্রণ৩০ গ্রাম১৫ গ্রাম

মোট প্রায় সাড়ে ২৫ কেজি ভেজা মিশ্রণ। শুকনা অংশ হিসাব করলে সাইলেজে প্রায় ৬.৪ কেজি, খড়ে ১.৪, দানাদারে ৩.৫, মোট প্রায় ১১.৩ কেজি, অর্থাৎ মিশ্রণের ৪৪ শতাংশ শুকনা। শুকনা অংশে আঁশ প্রায় ৬৯ আর দানাদার ৩১ ভাগ, BLRI-র পরীক্ষার ৬০:৪০ থেকে একটু বেশি আঁশের দিকে, যা ভালো মানের দানা-ভরা সাইলেজে চলে। দুধ বেশি হলে দানাদার বাড়বে, আর অনুপাত ৬০:৪০-এর দিকে সরবে।

খরচের দিক থেকে: দিনে ২০ কেজি খামারভেস্ট সাইলেজে ১৭০ টাকা, আর ৫০ কেজির এক বস্তা এই গাভীর আড়াই দিনে শেষ হয়, যা খোলা বস্তা ২-৩ দিনে শেষ করার নিয়মের মধ্যেই পড়ে। দুধের দামের সাথে মিলিয়ে দেখতে দুধের হিসাবের ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন; আমরা কোনো আয়ের অঙ্ক লিখি না, কারণ সেটা আপনার দুধের দাম আর দোকানের দরের উপর নির্ভর করে।

৭. যে ভুলগুলো TMR-এর উদ্দেশ্য নষ্ট করে

  • সারা দিনের মিশ্রণ সকালে বানিয়ে রাখা। সাইলেজ বাতাস পেলে গরম হতে শুরু করে, আর দানাদার মেশানো ভেজা খাবার তাতে আরও দ্রুত নষ্ট হয়। প্রতি বেলায় টাটকা মেশান, আর গরম বা টক-পচা গন্ধ পেলে নষ্ট সাইলেজের লক্ষণ মিলিয়ে দেখুন।
  • সব গরুকে একই মিশ্রণ। দুধের গাভী, শুকনা গাভী আর বাছুরের চাহিদা আলাদা। দল আলাদা হলে মিশ্রণও আলাদা; অন্তত দানাদারের ভাগ বদলান।
  • খড় লম্বা রেখে দেওয়া। তাহলে মেশানো আর আলাদা খাওয়ানোয় পার্থক্য থাকে না, গরু খড় সরিয়ে বাকিটা খায়।
  • অনেক বেশি পিষে মেশানো। আঁশ গুঁড়া হয়ে গেলে জাবর কাটার জন্য দরকারি লম্বা আঁশ কমে।
  • হঠাৎ বদল। নতুন মিশ্রণে গরুকে ধীরে অভ্যস্ত করুন, যেমন প্রথমবার সাইলেজ খাওয়ানোর গাইডে আছে।

সাধারণ প্রশ্ন

TMR মানে কী?

TMR (Total Mixed Ration, টোটাল মিক্সড রেশন) মানে গরুর দিনের পুরো খাবার, অর্থাৎ সাইলেজ বা ঘাস, খড়, দানাদার আর লবণ-খনিজ, মেপে এক সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো, যাতে গরু বেছে খেতে না পারে এবং প্রতিটি কামড়ে একই পুষ্টি পায়।

TMR বানাতে কি মিক্সার মেশিন লাগে?

না। ছোট খামারে পরিষ্কার পলিথিন বা পাকা মেঝেতে বেলচা দিয়ে হাতেই মেশানো যায়। নিয়ম হলো উপাদান মেপে নেওয়া, খনিজ আগে দানাদারে মেশানো, সাইলেজের উপর দানাদার ছিটানো, তারপর ছোট করে কাটা খড় দিয়ে কয়েকবার উল্টে দেওয়া।

TMR-এ আঁশ আর দানাদারের অনুপাত কত হবে?

BLRI-র গবেষণায় শুকনা অংশের হিসাবে আঁশ ৬০ আর দানাদার ৪০ একটা যুক্তিসঙ্গত শুরু: বাড়ন্ত ষাঁড়ে এই অনুপাতে খাদ্য গ্রহণ ও হজম সবচেয়ে বেশি ছিল, আর দুধের গাভীর পরীক্ষায় ৬০:৪০ ও ৫০:৫০ দুটোই ব্যবহার হয়েছে। দুধ যত বেশি, দানাদারের ভাগ তত বেশি লাগে।

TMR কতক্ষণ আগে মিশিয়ে রাখা যায়?

যত কম সময়, তত ভালো। সাইলেজ বাতাস পেলে গরম হয়ে নষ্ট হতে শুরু করে, আর দানাদার মেশানো ভেজা মিশ্রণে তা আরও দ্রুত হয়। তাই প্রতি বেলার জন্য আলাদা মেশান, আর খাওয়ানোর ঠিক আগে।

সাইলেজ ছাড়া কি TMR বানানো যায়?

যায়, BLRI-র একটা পরীক্ষা ধানের খড়ভিত্তিক TMR দিয়েই হয়েছে। তবে শুধু খড় আর শুকনা দানাদারের মিশ্রণে গরু সহজে গুঁড়া আলাদা করে ফেলে, তাই শুকনা অংশ ৫৫ শতাংশের বেশি হলে পানি মেশানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সাইলেজ থাকলে এর আর্দ্রতাই কাজটা করে।

তথ্যসূত্র

পরের ধাপ: সাইলেজ নিতে চাইলে

খামারভেস্ট সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা। আগে টাকা নয়, বস্তা হাতে পেয়ে টাকা; পরিবহন খরচ কনফার্মেশন কলে জানানো হয়।

সম্পর্কিত গাইড

সাইলেজ কেনার আগে

আপনার জেলায় সাইলেজ: দাম ও ডেলিভারি

জেলা বেছে নিন, সেখানে কীভাবে অর্ডার ও ডেলিভারি হয় দেখে নিন।

খামারভেস্ট সাইলেজ (Khamarvest Silage)

মিশ্রণের মূল উপাদানটা হাতের কাছে রাখুন

ভুট্টা সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা, পণ্য হাতে পেয়ে টাকা। পরিবহন কনফার্মেশন কলে জানানো হয়, কোনো ন্যূনতম অর্ডার নেই।

WhatsApp-এ কথা বলুন

৮.৫০ টাকা কেজিহাতে পেয়ে টাকা

কল করুন WhatsApp-এ অর্ডার