
এক কথায় উত্তর
এই সাইটের প্রায় প্রতিটি খাদ্য-গাইডে লেখা থাকে "খনিজ মিশ্রণ দিন", কিন্তু কোনটা, কতটা আর কেন, সেটা কোথাও বলা হয়নি। কারণটা সংখ্যায়: দুধের গাভীর রেশনে ফসফরাস লাগে শুষ্ক পদার্থের ০.৩৫-০.৩৯%, আর দক্ষিণ এশিয়ায় মাপা খড়ে পাওয়া গেছে ০.০৬-০.১২%। খড় চাহিদার এক-তৃতীয়াংশও দেয় না।
১. ঘাটতিটা কত বড়, সংখ্যায়
খনিজ চোখে দেখা যায় না, ওজনেও প্রায় কিছুই নয়, তাই বাদ দিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু চাহিদা আর জোগান পাশাপাশি রাখলে ফারাকটা স্পষ্ট হয়।
| খনিজ | দুধের গাভীর চাহিদা (শুষ্ক পদার্থের %) |
খড়ে যা পাওয়া গেছে |
|---|---|---|
| ফসফরাস | ০.৩৫ - ০.৩৯% | ০.০৬ - ০.১২% |
| ক্যালসিয়াম | ০.৫৮ - ০.৬৪% | ০.২৯% (গমের খড়) |
| ম্যাগনেসিয়াম | চাহিদা আছে | ০.১৪% (ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত) |
| তামা | সংকট মাত্রা ৮ ppm | ২.৯৯ ppm (ধানের খড়) |
| দস্তা | চাহিদা আছে | ১৮ ppm (কম হিসেবে চিহ্নিত) |
চাহিদার সংখ্যাগুলো MSD ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল থেকে, আর খড়ের সংখ্যাগুলো ভারতের ঝাড়খণ্ডে করা এক গবেষণা থেকে, যেখানে ধান ও গমের খড়ভিত্তিক স্মলহোল্ডার খামারের খাদ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের খামারের চিত্রও এর কাছাকাছি, কারণ এখানেও মূল আঁশ ধানের খড়। MSD আলাদা করে বলছে, আঁশনির্ভর খাদ্যব্যবস্থায় ফসফরাসই প্রথম সীমাবদ্ধকারী খনিজ, কারণ আঁশজাতীয় খাদ্যে ফসফরাস কম থাকে।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার: খামারভেস্ট সাইলেজ এই ঘাটতি পূরণ করে না। সাইলেজ আঁশ ও শক্তির জোগান দেয়, খনিজের নয়। তাই সাইলেজ খাওয়ালেও খনিজ মিশ্রণ আলাদা করেই লাগবে।
২. খনিজ দুই ধরনের
- ম্যাক্রো খনিজ, লাগে বেশি পরিমাণেক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার আর লবণ (সোডিয়াম)। হাড়, দুধ, পেশি ও স্নায়ুর কাজে লাগে। MSD অনুযায়ী দুধের গাভীর রেশনে লবণ লাগে শুষ্ক পদার্থের ০.১৫-০.২৩%।
- ট্রেস খনিজ, লাগে সামান্য কিন্তু বাদ দেওয়া যায় নাদস্তা, তামা, কোবাল্ট, সেলেনিয়াম, আয়োডিন। পরিমাণে ppm-এর হিসাব, অথচ ঘাটতি হলে প্রজনন, রোগপ্রতিরোধ ও বাছুরের স্বাস্থ্য সরাসরি ভোগে।
বাজারে যেটাকে "মিনারেল মিক্সচার" বলা হয়, সেটা মূলত এই দুই দলের মিশ্রণ। শুধু লবণ দেওয়া আর খনিজ মিশ্রণ দেওয়া এক জিনিস নয়, লবণে কেবল সোডিয়াম মেলে।
৩. গরু সত্যিই ঘাটতিতে ভুগছে কি না
খাদ্যে কম থাকা এক কথা, গরুর শরীরে ঘাটতি ধরা পড়া আরেক কথা। ওই একই গবেষণায় গাভীর লোম পরীক্ষা করে দেখা গেছে তামার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ আর দস্তার ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ গাভীর মাত্রা স্বাভাবিকের নিচে। অর্থাৎ পরীক্ষা করা প্রতিটি গাভীই দস্তার ঘাটতিতে ছিল।
একটা সীমাবদ্ধতা সৎভাবে বলে রাখা দরকার। ওই গবেষণাটি ছিল পর্যবেক্ষণমূলক, অর্থাৎ এটি ঘাটতি মেপেছে, কিন্তু খনিজ মিশ্রণ খাওয়ানোর পর দুধ বা প্রজনন কতটা বদলাল তা মাপেনি। তাই এই সংখ্যাগুলো ঘাটতির প্রমাণ, ফল বাড়ার প্রতিশ্রুতি নয়। কেউ খনিজ বিক্রি করতে গিয়ে নির্দিষ্ট ফলের অঙ্ক বললে তার ভিত্তিটা জিজ্ঞাসা করুন।
৪. যে লক্ষণগুলো খামারি অন্য কিছু ভাবেন
খনিজের ঘাটতি হঠাৎ কিছু ঘটায় না, ধীরে ধীরে জমে। তাই খামারি সাধারণত ভাবেন গরুটা দুর্বল, বা জাতটাই খারাপ। MSD ভেটেরিনারি ম্যানুয়ালের বর্ণনা অনুযায়ী:
| যে খনিজের ঘাটতি | যা দেখা যায় |
|---|---|
| দস্তা | রুচি কমে যাওয়া, চামড়া ও লোম খারাপ হওয়া, রোগপ্রতিরোধ কমা, ষাঁড়ের প্রজনন ক্ষমতা কমা |
| সেলেনিয়াম | গর্ভফুল আটকে যাওয়া, বাছুরের হোয়াইট মাসল ডিজিজ, রোগপ্রতিরোধ কমা |
| আয়োডিন | গলগণ্ড, মৃত বাছুর প্রসব, বন্ধ্যাত্ব, লোমহীন বাছুর |
| ক্যালসিয়াম (বিয়ানোর সময়) | মিল্ক ফিভার, উঠে দাঁড়াতে না পারা |
তালিকাটা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় কেন এই বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল। গর্ভফুল আটকে যাওয়া, বারবার বীজ দিয়েও গর্ভ না হওয়া, মৃত বাছুর, এগুলোর পেছনে খনিজের ঘাটতিও থাকতে পারে। গাভী ডাকে না এলে করণীয় আছে প্রজননের গাইডে, আর বিয়ানোর সময়ের ক্যালসিয়াম ও মিল্ক ফিভারের প্রস্তুতি আছে ড্রাই পিরিয়ডের গাইডে।
ফসফরাস নিয়ে একটা সৎ সংশোধনী: প্রজননে সমস্যা ফসফরাসের ঘাটতিতেও হয়, তবে MSD বলছে সেটা ঘটে মূলত অত্যন্ত কম মাত্রায়। অর্থাৎ প্রতিটি প্রজনন সমস্যার কারণ খনিজ নয়, কিন্তু খড়ভিত্তিক রেশনে এটি তালিকার বাইরেও নয়।
৫. কতটা দেবেন আর কীভাবে
এখানে একটা সংখ্যা বলে দেওয়া যেত, কিন্তু সেটা ভুল হতো। বাজারের প্রতিটি খনিজ মিশ্রণের ঘনত্ব আলাদা, তাই একই পরিমাণে আলাদা মাত্রা যায়।
- ✓প্যাকেটের নির্দেশ মানুন: প্রতিটি মিশ্রণের গায়ে দৈনিক মাত্রা লেখা থাকে। না থাকলে সেই পণ্য কিনবেন না, আপনি জানেন না কী দিচ্ছেন।
- ✓দানাদারের সাথে মিশিয়ে দিন: সাইলেজ বা ঘাসের উপর ছিটিয়ে দিলে গরু বেছে বেছে খায় আর খনিজটুকু পাত্রে পড়ে থাকে। অল্প পরিমাণের জিনিস আগে অল্প দানাদারের সাথে মিশিয়ে, তারপর বাকিটার সাথে মেশানোই নিয়ম।
- ✓প্রতিদিন, অল্প করে: সপ্তাহে একদিন বেশি দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া যায় না। শরীর যতটা লাগে ততটাই কাজে লাগায়, বাকিটা বেরিয়ে যায়।
- ✓মিনারেল ব্লক সহজ, কিন্তু অসম: ঝুলিয়ে রাখা ব্লক থেকে কোনো গরু বেশি চাটে, কোনোটা প্রায় চাটেই না। নিশ্চিত হতে চাইলে খাবারের সাথে মেশানোই ভালো।
- ✓শুষ্ক কালের গাভীর হিসাব আলাদা: MSD অনুযায়ী শুষ্ক কালে ক্যালসিয়ামের চাহিদা ০.৩১%, দুধ দেওয়ার সময়ের প্রায় অর্ধেক। বিয়ানোর আগে ক্যালসিয়াম ব্যবস্থাপনার আলাদা নিয়ম আছে, ভেটের পরামর্শ নিন।
৬. যে দুটি ভুল সবচেয়ে বেশি হয়
- নিরাপত্তার নামে দ্বিগুণ দেওয়াবেশি দিলে বেশি উপকার, এটা খনিজের ক্ষেত্রে খাটে না। কিছু খনিজ বেশি হলে বিষক্রিয়া করে, আর খনিজগুলো নিজেদের মধ্যে শোষণে প্রতিযোগিতা করে, একটি বেশি হলে আরেকটি কমে যায়। নির্দিষ্ট মাত্রাই মানুন।
- ফল দেখা যায় না বলে বাদ দেওয়াএটিই বেশি ঘটে। খনিজ বন্ধ করলে পরদিন কিছুই হয় না, ফল দেখা যায় কয়েক মাস পরে, প্রজনন ও বাছুরের স্বাস্থ্যে। ততদিনে কারণটা আর কেউ খনিজের সাথে মেলায় না। খামারভেস্ট সাইলেজের রেশন-পরামর্শেও তাই খনিজ বাদ দিতে বলা হয় না, যদিও সেটা আমাদের বিক্রির পণ্য নয়।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নোত্তর ও স্টক আপডেট দেখতে যুক্ত হন।