খামারি গাইড · ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গরুর দানাদার খাদ্য: কতটা লাগে, কী দিয়ে তৈরি

খাদ্যের গাইডে বারবার লেখা থাকে সাইলেজের সাথে দানাদার লাগবে। কিন্তু দানাদার আসলে কী, কতটা লাগে আর কীসে তৈরি, সেটা কেউ গুছিয়ে বলে না। এই গাইড সেটাই বলে।

ভুট্টা খেত থেকে সাইলেজের কাঁচামাল সংগ্রহ, খামারভেস্ট সাইলেজ

এক কথায় উত্তর

দানাদার হলো শক্তি ও প্রোটিনে ঘন খাদ্যের মিশ্রণ, যা আঁশের সাথে ঘাটতি পূরণ করতে দেওয়া হয়, একা খাওয়ানোর জন্য নয়। সাধারণ নিয়ম: প্রতি ২-৩ লিটার দুধের জন্য ১ কেজি। আর সবচেয়ে কাজের কথাটা হলো, আঁশজাতীয় খাদ্য যত ভালো, একই দুধের জন্য দানাদার তত কম লাগে।

১. দানাদার কী, আর সাইলেজ থাকতেও কেন লাগে

এই সাইটের প্রায় প্রতিটি গাইডে একটা কথা ঘুরেফিরে আসে: সাইলেজের সাথে দানাদার লাগবে। কিন্তু দানাদার জিনিসটা আসলে কী, আর কেন লাগে, সেটা আলাদা করে বলা হয়নি কোথাও। এই গাইডটা সেই ঘাটতি পূরণের জন্য।

কারণটা সংখ্যায় দেখলে পরিষ্কার হয়। FAO-র প্রকাশিত মাপে ভুট্টা সাইলেজের ক্রুড প্রোটিন ৭.৩৭ থেকে ৮.৩২ শতাংশ। দুধ উৎপাদনকারী গাভীর রেশনে এর চেয়ে বেশি প্রোটিন লাগে। অর্থাৎ সাইলেজ পেট ভরায়, আঁশ দেয়, দানার শক্তিও দেয়, কিন্তু প্রোটিনের ঘাটতিটুকু থেকেই যায়। ওই ঘাটতি পূরণের কাজটাই দানাদারের।

উল্টোটাও সত্যি, আর সেটা বিক্রেতারা কম বলেন: দানাদার দিয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা করলে খরচ বাড়ে, ফল বাড়ে না। দানাদার রেশনের সবচেয়ে দামি অংশ, ৪০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। এটি ভিত্তি নয়, ভিত্তির উপরে বসানো অংশ। ভিত্তিটা হলো আঁশ, যেটা খামারভেস্ট সাইলেজের মতো সাইলেজ, কাঁচা ঘাস বা খড় থেকে আসে।

২. দানাদারে আসলে কী কী থাকে

যেকোনো দানাদার মিশ্রণ তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. শক্তির উপাদান (মিশ্রণের সবচেয়ে বড় অংশ)ভুট্টা ভাঙা, গমের ভুসি, চালের কুঁড়া, ভুট্টার ভুসি। এগুলো সস্তা এবং মূলত শক্তি জোগায়, প্রোটিন কম।
  2. প্রোটিনের উপাদান (খৈল)সরিষা, তিল, নারকেল, সয়াবিন বা বাদামের খৈল। ILRI-র তালিকায় তৈলবীজের খৈলকে উচ্চ প্রোটিনের উৎস ধরা হয়েছে, যেমন কটনসিড কেকে ক্রুড প্রোটিন ২৩ থেকে ৩৫ শতাংশ। দানাদারের দাম মূলত এই অংশটাই ঠিক করে।
  3. খনিজ মিশ্রণ ও লবণ (অল্প, কিন্তু বাদ দেওয়া যায় না)পরিমাণে সবচেয়ে কম, অথচ বাদ পড়লে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজের ঘাটতিতে দুধ, প্রজনন ও হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়। বাজারে মিনারেল মিক্সচার হিসেবে পাওয়া যায়।

ওজন মাপার ব্যবস্থা না থাকলে ILRI-র সহজ নিয়ম হলো শক্তির উপাদান আর প্রোটিনের উপাদান ৩:২ অনুপাতে মেশানো, সাথে অল্প খনিজ ও লবণ। এভাবে মেশানো মিশ্রণ মোটামুটি বাণিজ্যিক ডেইরি মিলের কাছাকাছি দাঁড়ায়, যার ক্রুড প্রোটিন সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ।

৩. দৈনিক কত কেজি দানাদার

ILRI-র স্মলহোল্ডার ডেইরি নির্দেশনায় সাধারণ নিয়ম হলো প্রতি ২ থেকে ৩ লিটার দুধের জন্য ১ কেজি দানাদার। হিসাবটা এভাবে দাঁড়ায়:

দৈনিক দুধ দানাদার (আনুমানিক) দানাদারের খরচ (৪৫ টাকা/কেজি ধরে)
৬ লিটার২ - ৩ কেজি৯০ - ১৩৫ টাকা
৯ লিটার৩ - ৪.৫ কেজি১৩৫ - ২০০ টাকা
১২ লিটার৪ - ৬ কেজি১৮০ - ২৭০ টাকা

কেনিয়ার স্মলহোল্ডার ডেইরি প্রকল্পের হিসাবে বেশিরভাগ খামারি দৈনিক ২ কেজি দানাদার দিয়ে ৫ থেকে ৭ লিটার দুধ পান, যা এই নিয়মের সাথেই মেলে। নিজের খামারের সংখ্যা বসিয়ে আয়-ব্যয় মিলিয়ে দেখতে দুধের লাভ-লস ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন।

৪. আঁশ ভালো হলে দানাদার কম লাগে

এটাই এই গাইডের সবচেয়ে কাজের অংশ। ILRI-র একই নির্দেশিকায় দেখানো হয়েছে, একই পরিমাণ দানাদার দিয়ে কত দুধ পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে আঁশজাতীয় খাদ্যের মানের উপর। নিচের তালিকাটি পূর্ব আফ্রিকার ৩৫০ থেকে ৫০০ কেজি ওজনের গাভীর জন্য দেওয়া, তাই সংখ্যাগুলো হুবহু বাংলাদেশের নয়, কিন্তু নিয়মটা সব জায়গায় একই:

আঁশজাতীয় খাদ্যের মান দানাদার ০ কেজি দানাদার ৩ কেজি দানাদার ৬ কেজি
খারাপ (শুধু ফসলের অবশিষ্টাংশ)০ লিটার২ - ৫ লিটার৬ - ১০ লিটার
মাঝারি (পরিণত হে ও ডাল জাতীয় ঘাস)৫ লিটারের কম৫ - ১০ লিটার১০ - ১৮ লিটার
ভালো (ভালো হে বা নেপিয়ার ও ডাল জাতীয় ঘাস)৮ - ১২ লিটার১২ - ২০ লিটার (সূত্রে ২ কেজিতে)২০ - ৩০ লিটার

প্রথম ঘরটা খেয়াল করুন। খারাপ আঁশে দানাদার ছাড়া দুধ শূন্য, অথচ ভালো আঁশে এক কেজি দানাদার না দিয়েও ৮ থেকে ১২ লিটার। মানে আঁশজাতীয় খাদ্যই আসল ভিত্তি, আর দানাদার সেই ভিত্তির উপরে যোগ হয়।

খামারভেস্ট সাইলেজ এখানেই কাজে লাগে: এটি সারা বছর একই মানের আঁশ ও দানার শক্তি জোগায়, তাই আঁশের মান মৌসুমের সাথে ওঠানামা করে না। তবে সাইলেজ দানাদারের বিকল্প নয়, কেউ সেটা বললে ভুল বলছেন। সাইলেজ ভিত্তিটা শক্ত করে, দানাদার ঘাটতিটুকু পূরণ করে। দুটোর তুলনা ও রেশনে কার কী কাজ, তা আছে সাইলেজ নাকি ঘাস নাকি খড় গাইডে

৫. যে ৫টি ভুলে দানাদারের টাকা নষ্ট হয়

  • !একবারে পুরোটা দেওয়া: রুমেনে হঠাৎ অনেক দানা গেলে এসিড বেড়ে হজম বিগড়ে যায়। দৈনিক পরিমাণ অন্তত দুই বেলায় ভাগ করুন।
  • !খালি পেটে দানাদার আগে দেওয়া: আঁশ আগে, দানাদার পরে। সাইলেজ বা খড় পেটে থাকলে দানার ধাক্কাটা সামলে যায়। পেট ফাঁপার লক্ষণ ও করণীয় আছে ব্লোটের গাইডে
  • !খনিজ বাদ দেওয়া: পরিমাণে সবচেয়ে কম বলে অনেকে বাদ দেন। ফল দেখা যায় কয়েক মাস পরে, দুধ কমে আর গাভী ঠিকমতো ডাকে আসে না।
  • !কী কিনছেন না জেনে কেনা: প্যাকেটে ক্রুড প্রোটিনের শতাংশ ও উপাদানের তালিকা না থাকলে আপনি আসলে জানেন না কী কিনছেন। এটা ঠিক সেই প্রশ্ন যা পুষ্টিমানের গাইডে সাইলেজের ক্ষেত্রেও করতে বলা হয়েছে।
  • !আঁশ কমিয়ে দানাদার বাড়ানো: সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল। দামি উপাদান দিয়ে সস্তা উপাদানের কাজ করানো হয়, আর রুমেনও ভোগে।

৬. নিজে মেশাতে চাইলে

ILRI-র নির্দেশিকা বলছে উগান্ডার হিসাবে নিজে মিশিয়ে নিলে মোট খরচের ৩০ শতাংশের বেশি বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশে উপাদানের দাম আলাদা, তাই সংখ্যাটা এখানে হুবহু ধরে নেওয়া যাবে না, নিজের এলাকার দামে হিসাব করে দেখতে হবে। মেশানোর নিয়মটা সহজ:

  1. উপাদান আলাদা করে সাজানকোনটা শক্তির, কোনটা প্রোটিনের, কোনটা খনিজ, আগে ভাগ করে নিন।
  2. শক্তি ও প্রোটিন ৩:২ অনুপাতেওজন মাপার ব্যবস্থা না থাকলে এই অনুপাতই ILRI-র পরামর্শ।
  3. খনিজ ও লবণ আগে মিশিয়ে নিনঅল্প পরিমাণের জিনিস আগে নিজেদের মধ্যে মিশিয়ে তারপর বড় অংশের সাথে মেশালে সমানভাবে ছড়ায়।
  4. ভালো করে মেশান, শুকনা জায়গায় রাখুনপরিষ্কার জায়গায় মেশান, বস্তায় ভরে শুকনা জায়গায় রাখুন। ভেজা লাগলে বা ছাতা পড়লে খাওয়াবেন না।

নিজের মিশ্রণে ঠিক কত শতাংশ প্রোটিন হলো তা নিশ্চিত করে বলা যায় না ল্যাব পরীক্ষা ছাড়া, ঠিক যেমন সাইলেজের ক্ষেত্রেও যায় না। তাই অনুপাতটা নিয়ম মেনে রাখুন আর পশুর সাড়া দেখে সিদ্ধান্ত নিন: দুধ ধরে রাখছে কি না, গোবর স্বাভাবিক কি না, শরীর ধরে রাখছে কি না।

খামারভেস্ট Facebook পেজ

খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নোত্তর ও স্টক আপডেট পেতে ফেসবুকে যুক্ত হন।

পেজে ফলো দিন

তথ্যসূত্র

সম্পর্কিত গাইড

খামারভেস্ট সাইলেজ (Khamarvest Silage)

আঁশের ভিত্তিটা শক্ত করুন

১০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি এয়ারটাইট বস্তা, পণ্য হাতে পেয়ে টাকা। WhatsApp-এ এলাকা ও পশুর সংখ্যা লিখে পাঠান।

WhatsApp-এ কথা বলুন