
এক কথায় উত্তর
গরু নিজে ঘাস হজম করে না। রুমেনের ভেতরের কোটি কোটি জীবাণু আঁশ ভেঙে এসিড বানায়, গরু সেই এসিড শুষে নিয়ে শক্তি পায়। অর্থাৎ আপনি গরুকে নয়, গরুর ভেতরের জীবাণুগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। খাওয়ানোর প্রায় সব নিয়ম এই একটা কথা থেকেই আসে।
১. রুমেন আসলে একটা গাঁজন-চেম্বার
গরুর পাকস্থলীর সবচেয়ে বড় প্রকোষ্ঠটার নাম রুমেন। ভেতরে হজমের রস নয়, ভেতরে থাকে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব। ঘাস, খড় বা সাইলেজের যে আঁশ মানুষ বা মুরগি একেবারেই হজম করতে পারে না, এই জীবাণুরা সেটাই ভেঙে ফেলে এবং ভাঙার সময় এসিড তৈরি করে। গরু ওই এসিডই রুমেনের দেয়াল দিয়ে শুষে নেয়, আর সেটাই তার শক্তির প্রধান উৎস।
এটা হুবহু সেই একই প্রক্রিয়া যা সাইলেজের বস্তার ভেতরে ঘটে, শুধু জায়গাটা আলাদা। বস্তায় জীবাণু চিনি ভেঙে এসিড বানায় বলে খাদ্য সংরক্ষিত থাকে; রুমেনে জীবাণু আঁশ ভেঙে এসিড বানায় বলে গরু শক্তি পায়। একই রসায়ন, দুই জায়গায়। বস্তার ভেতরের ধাপগুলো দেখুন গাঁজনের ৪টি ধাপে।
এই কারণেই একটা কথা মনে রাখা দরকার: খাদ্য বদলানো মানে শুধু গরুর পছন্দ বদলানো নয়, তার ভেতরের একটা গোটা জীবাণু-জনগোষ্ঠী বদলানো।
২. সবকিছু ঠিক করে দেয় pH
জীবাণুরা যত এসিড বানায়, রুমেনের pH তত নামে। একটু নামা স্বাভাবিক, কিন্তু বেশি নামলে আঁশ-ভাঙা জীবাণুরাই মরতে শুরু করে। সাধারণভাবে pH ৬ এর নিচে নামলে এসিডোসিসের ঝুঁকি ধরা হয়।
একটি প্রকাশিত গবেষণায় একই গরুকে দুই ধরনের খাদ্য দিয়ে রুমেনের pH মাপা হয়েছিল। ফলটা খাওয়ানোর নিয়মের পুরো যুক্তিটাই সংখ্যায় দেখিয়ে দেয়:
| খাদ্য | খাওয়ানোর আগে pH | ৪ ঘণ্টা পরে pH |
|---|---|---|
| আঁশপ্রধান | ৬.৯০ | ৬.০৬ |
| দানাদারপ্রধান | ৬.৮৪ | ৫.৭৬ |
দুটো খাদ্যেই pH নেমেছে, কিন্তু আঁশপ্রধান খাদ্যে থেমেছে ৬.০৬ এ, ঝুঁকির সীমার ঠিক উপরে। দানাদারপ্রধান খাদ্যে নেমে গেছে ৫.৭৬ এ, সীমার নিচে। এটাই কারণ, কেন আঁশ আগে আর দানাদার পরে, আর কেন সাইলেজের সাথেও দৈনিক ১-২ কেজি শুকনা খড় রাখতে বলা হয়।
৩. জাবর কাটা গরুর নিজের ওষুধ
গরু শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে দেখলে মনে হয় সে অলস সময় কাটাচ্ছে। আসলে তখন সে রুমেনের এসিড সামলাচ্ছে।
জাবর কাটার সময় প্রচুর লালা তৈরি হয়, আর সেই লালায় থাকে বাইকার্বনেট ও ফসফেট বাফার, যা রুমেনের pH ধরে রাখে এবং আঁশ-ভাঙা জীবাণুদের বাঁচিয়ে রাখে। ৩৬৫টি গাভীর উপর করা এক গবেষণায় গড় জাবর কাটার সময় ছিল দৈনিক প্রায় ৪৫৮ মিনিট, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা। বিভিন্ন গবেষণায় সীমা ২৩৬ থেকে ৬১০ মিনিট।
একটা সৎ কথা এখানে বলা দরকার। ওই একই গবেষণায় দেখা গেছে জাবর কাটার সময় বেশি হলেই দুধ বেশি হয় না, তিন দলের দুধের পরিমাণে অর্থপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তাই জাবর কাটাকে দুধ বাড়ার মাপকাঠি ভাববেন না, ভাববেন রুমেন ঠিক আছে কি না তার সংকেত হিসেবে। মিহি করে কাটা বা খুব নরম খাদ্যে জাবর কাটা কমে যায়, তখন লালাও কম, বাফারও কম।
৪. হঠাৎ খাদ্য বদলালে ভেতরে কী ঘটে
জীবাণুর দলটা যে খাদ্যে অভ্যস্ত, সেটাই তারা ভালো ভাঙতে পারে। খাদ্য একদিনে বদলে গেলে পুরোনো দল তাদের খাবার হারায়, আর নতুন খাদ্যের উপযোগী দল তখনো যথেষ্ট সংখ্যায় বাড়েনি। মাঝখানের এই ফাঁকেই রুচি কমে, গোবর পাতলা হয়, কখনো পেট ফাঁপে।
গবেষণায় দেখা গেছে হঠাৎ প্রচুর সহজপাচ্য দানা এলে রুমেনের জীবাণু-জনগোষ্ঠীতে ধারাবাহিক পরিবর্তন শুরু হয়, এসিড-সংবেদনশীল দল ধীরে ধীরে এসিড-সহনশীল দল দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। এই বদলটা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার, একদিনের নয়।
এজন্যই নতুন খাদ্য ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়, আর সেটাই প্রথমবার সাইলেজ খাওয়ানোর ৭ দিনের নিয়মের পেছনের একমাত্র কারণ। নিয়মটা বিক্রেতার সাবধানতা নয়, জীববিজ্ঞান।
৫. এই একটা জিনিস বুঝলে বাকি সব নিয়ম মিলে যায়
এই সাইটের প্রায় প্রতিটি খাদ্য-নিয়মের কারণ রুমেনেই। এক নজরে:
| যে নিয়মটা শোনেন | রুমেনের দিক থেকে কারণ |
|---|---|
| ৭ দিনে ধীরে অভ্যাস করান | জীবাণুর দল বদলাতে সময় লাগে |
| আঁশ আগে, দানাদার পরে | খালি রুমেনে দানা গেলে pH হুড়মুড় করে নামে |
| সাইলেজের সাথেও ১-২ কেজি খড় | লম্বা আঁশ জাবর কাটায়, লালা বাড়ে, pH ধরে থাকে |
| দানাদার দুই বেলায় ভাগ করুন | একবারে অনেক দানা মানে একবারে অনেক এসিড |
| শীতে আঁশ বাড়ান, দানাদার নয় | আঁশের গাঁজন থেকেই শরীরের তাপ আসে |
| ছোট বাছুরকে সাইলেজ নয় | জন্মের সময় রুমেন কার্যকর নয়, ধীরে গড়ে ওঠে |
| হঠাৎ কচি ভেজা ঘাস নয় | দ্রুত গাঁজনে গ্যাস জমে পেট ফাঁপে |
খামারভেস্ট সাইলেজের গাইডগুলোতে এই নিয়মগুলো বারবার আসে, কিন্তু কারণটা এক জায়গায় লেখা ছিল না। এই পাতাটা সেই ঘাটতি পূরণের জন্য।
৬. রুমেন ঠিক আছে কি না বোঝার ৪টি লক্ষণ
- ১জাবর কাটছে কি না: বিশ্রামের সময় পালের অন্তত অর্ধেক গরু জাবর কাটা স্বাভাবিক। হঠাৎ কমে গেলে রেশনে কিছু একটা বদলেছে।
- ২বাঁ পাশের কোমরের গর্ত: রুমেন বাঁ পাশে। ওই গর্ত ভরাট দেখালে খাওয়া ঠিক আছে, গভীর গর্ত মানে কম খাচ্ছে, আর অস্বাভাবিক ফুলে থাকা মানে গ্যাস জমেছে।
- ৩গোবরের অবস্থা: খুব পাতলা মানে দ্রুত হজম ও এসিডের চাপ, খুব শক্ত মানে আঁশ বেশি বা পানি কম। গোবরে আস্ত দানা দেখা গেলে চিবানো বা হজম কোথাও গোলমাল।
- ৪খাওয়ার আগ্রহ: রুমেনের গোলমালের প্রথম লক্ষণ প্রায়ই রুচি কমে যাওয়া, জ্বর বা অন্য কিছুর আগেই।
এর কোনোটা বদলালে আগে রেশন ও খাওয়ানোর ধরন দেখুন, ওষুধ নয়। আর লক্ষণ গুরুতর হলে পশুচিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন, অনলাইন গাইড চিকিৎসার বিকল্প নয়।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নোত্তর ও স্টক আপডেট দেখতে যুক্ত হন।