
এক কথায় উত্তর
ঠান্ডায় গরুর শক্তির চাহিদা বাড়ে, প্রোটিন বা খনিজের নয়। সহনসীমার নিচে প্রতি এক ডিগ্রিতে শক্তির চাহিদা প্রায় ১% বাড়ে। আর সেই তাপ বানানোর কারখানাটা গরুর নিজের পেটেই, রুমেনে আঁশের গাঁজন। তাই শীতের আসল প্রস্তুতি দানাদার বাড়ানো নয়, ভালো আঁশ নিশ্চিত করা।
১. কত ডিগ্রিতে সমস্যা শুরু হয়
গরু ঠিক কত ঠান্ডায় কষ্ট পায় তার একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, কারণ এটা নির্ভর করে বয়স, গায়ের লোম আর সবচেয়ে বেশি যেটার উপর, গা ভেজা কি না। প্রকাশিত এক্সটেনশন নির্দেশনা থেকে যা জানা যায়:
| পশু | স্বচ্ছন্দ তাপমাত্রা | ঠান্ডার চাপ শুরু |
|---|---|---|
| জন্মের প্রথম মাসের বাছুর | ১৩ - ২১ ডিগ্রি সে. | ১০ ডিগ্রির নিচে |
| ১ মাস থেকে দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত | ৮ - ২৭ ডিগ্রি সে. | অনেক নিচে নামলে |
| প্রাপ্তবয়স্ক, শুকনা গা | সহনসীমা অনেক নিচে | সাধারণত বাংলাদেশে পৌঁছায় না |
| প্রাপ্তবয়স্ক, ভেজা গা | সহনসীমা অনেক উপরে উঠে আসে | অল্প ঠান্ডাতেই কষ্ট |
শেষ সারিটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি। আমাদের শীত ইউরোপ-আমেরিকার মতো নয়, কিন্তু কুয়াশা, স্যাঁতসেঁতে গোয়াল আর ভেজা গা মিলে ঠান্ডার চাপটা অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। শুকনো থাকা আর বাতাস আটকানোই তাই কম্বলের চেয়ে বড় কাজ করে।
২. বাংলাদেশে ঝুঁকিটা কোথায় ও কখন
প্রকাশিত জলবায়ু তথ্যে রংপুরে জানুয়ারির গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ডিসেম্বরে প্রায় ১৩ আর ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৪। এগুলো গড়, অর্থাৎ অনেক রাতে এর চেয়ে নিচে নামে।
এই সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে ছবিটা পরিষ্কার হয়: নবজাতক বাছুরের ঠান্ডার চাপ শুরু হয় ১০ ডিগ্রির নিচে, আর উত্তরবঙ্গে জানুয়ারির গড় সর্বনিম্নই প্রায় ১১। অর্থাৎ শীতের রাতে উত্তরের বাছুর নিয়মিতভাবেই ঝুঁকির সীমানায় থাকে। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ার খামারিদের জন্য এটি মৌসুমি সতর্কতা, শখের বিষয় নয়।
৩. ঠান্ডায় খাবারের চাহিদা কতটা বাড়ে
SDSU এক্সটেনশনের প্রচলিত নিয়ম: সহনসীমার নিচে প্রতি এক ডিগ্রির জন্য শক্তির (TDN) চাহিদা প্রায় ১% বাড়ে। খুব ঠান্ডা ও বাতাসের দিনে রক্ষণাবেক্ষণের শক্তির চাহিদা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দুটো কথা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এক, বাড়ে শুধু শক্তির চাহিদা, প্রোটিন, খনিজ বা ভিটামিনের নয়। দুই, বাড়তি শক্তি না দিলে শরীর চুপচাপ নিজের চর্বি পুড়িয়ে তাপ বানাতে থাকে। খামারি তখন দেখেন গরু হঠাৎ শুকিয়ে যাচ্ছে বা দুধ পড়ে যাচ্ছে, অথচ রোগের কোনো লক্ষণ নেই। কারণটা রোগ নয়, হিসাবের ঘাটতি।
৪. গরুর নিজের হিটারটা তার পেটেই
এটাই শীতের খাদ্য ব্যবস্থাপনার মূল কথা। রুমেনে আঁশ গাঁজন হওয়ার সময় তাপ তৈরি হয়, আর সেই তাপই ঠান্ডায় গরুকে ভেতর থেকে গরম রাখে। অর্থাৎ ভালো মানের আঁশ শীতের সবচেয়ে সস্তা হিটার।
এজন্যই শীতে প্রথম কাজ দানাদার বাড়ানো নয়, আঁশের পরিমাণ ও মান নিশ্চিত করা। অথচ শীতেই ঘাসের বাড়ন কমে, খড়ের দাম চড়ে, আর আঁশের মান পড়ে যায়, ঠিক যখন সবচেয়ে বেশি দরকার। ভুট্টা সাইলেজে আঁশের সাথে দানার শক্তিও থাকে, তাই শীতের রেশনে এটি দুটো কাজ একসাথে করে। খামারভেস্ট সাইলেজের বস্তা না-খোলা অবস্থায় ৬-১২ মাস ভালো থাকে, তাই শীত আসার আগেই নেওয়া যায়।
আঁশ, সাইলেজ ও দানাদারের কে কোন কাজ করে তা দেখুন এই তুলনায়, আর দানাদারের হিসাব আছে দানাদার খাদ্যের গাইডে।
৫. শীতে যা করবেন
- শুকনো রাখুন, এটাই সবচেয়ে বড় কাজভেজা গায়ে ঠান্ডার চাপ অনেক আগে শুরু হয়। গোয়ালের মেঝে শুকনো রাখুন, খড় বা শুকনো বিছানা দিন, চুইয়ে পড়া পানি বন্ধ করুন।
- বাতাস আটকান, কিন্তু বাতাস চলাচল বন্ধ নয়উত্তরের হাওয়া ঢোকা দিকটা চট বা পলিথিন দিয়ে আটকে দিন। তবে পুরোপুরি বন্ধ করলে ভেতরে আর্দ্রতা ও অ্যামোনিয়া জমে শ্বাসকষ্ট হয়।
- আঁশ আগে, দানাদার পরেআঁশের পরিমাণ ও মান আগে ঠিক করুন। দানাদার হঠাৎ বাড়ালে রুমেনের গোলমাল হতে পারে, আর ঠান্ডায় প্রোটিনের চাহিদা এমনিতেও বাড়ে না।
- পানি ঠান্ডা হলে খাওয়া কমেবরফশীতল পানি গরু কম খায়, আর পানি কম খেলে খাবারও কম খায়। সম্ভব হলে রোদে রাখা পানি দিন, অন্তত খুব ঠান্ডা পানি এড়ান।
- নবজাতক বাছুরকে আলাদা যত্নজন্মের পর দ্রুত শুকিয়ে দিন, শাল দুধ সময়মতো খাওয়ান, আর শুকনো বিছানায় বাতাসমুক্ত জায়গায় রাখুন। বিস্তারিত বাছুরের যত্নের গাইডে।
৬. শীত শুরুর আগেই যা ঠিক করে রাখবেন
শীতের সমস্যাগুলোর বেশিরভাগই আগে থেকে সামলানো যায়, মৌসুমে নয়। অক্টোবরের মধ্যে চারটা জিনিস ঠিক করে রাখলে পুরো শীত সহজে যায়:
- ১খাদ্যের হিসাব করে রাখুন: কত পশু, দৈনিক কত কেজি, কত মাস, তা থেকে মোট কত লাগবে। সাইলেজ ক্যালকুলেটরে সংখ্যা বসালেই বেরিয়ে আসে।
- ২মজুদের জায়গা ঠিক করুন: ছায়া, শুকনো, মাটি থেকে উঁচু পাটাতন, ইঁদুরমুক্ত। নিয়মগুলো সংরক্ষণের গাইডে।
- ৩গোয়াল মেরামত এখনই: ফুটো চাল, ভাঙা দেয়াল আর স্যাঁতসেঁতে মেঝে শীতের আগে সারিয়ে নিন। শীত পড়ার পর মেরামত করা কঠিন ও ব্যয়বহুল।
- ৪নতুন খাদ্যে অভ্যাস আগেই করান: শীতে হঠাৎ খাদ্য বদলাবেন না। এখন থেকে শুরু করলে ৭ দিনের নিয়মে অভ্যাস হয়ে যাবে, মৌসুমে আর ঝুঁকি থাকবে না।
শীতের পুরো খাদ্য পরিকল্পনা আছে শীতকালে গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনার গাইডে। আপনার জেলায় ডেলিভারির তথ্য এলাকার তালিকায়।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
শীতের প্রস্তুতি, স্টক আপডেট ও খামারিদের প্রশ্নোত্তর দেখতে যুক্ত হন।