গরুর পাকস্থলীতে খাবার হজমের সময় স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস তৈরি হয়, যা ঢেকুরের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। কোনো কারণে গ্যাস বের হতে না পারলে বা অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হলে পেট ফুলে ওঠে, এটাই পেট ফাঁপা বা ব্লোট। ফোলা পেট ফুসফুসে চাপ দেয় বলে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গরু শ্বাস নিতে পারে না। তাই এই সমস্যায় সবচেয়ে দামি জিনিস হলো সময়।
সবার আগে এটা পড়ুন
এই লেখা চিকিৎসার বিকল্প নয়। পেট ফাঁপার চিকিৎসা (ওষুধ, পাকস্থলীর নল, জরুরি অবস্থায় ট্রোকার) শুধু প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাজ। ইউটিউব দেখে বা দোকানির কথায় নিজে চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতি বছর বহু গরু মারা যায়। আপনার কাজ দুটো: লক্ষণ দ্রুত চেনা আর চিকিৎসককে দ্রুত খবর দেওয়া। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও কাছের চিকিৎসকের নম্বর আজই ফোনে সেভ করুন।
লক্ষণ: কোনটা দেখলে বুঝবেন
- পেটের বাম দিক অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা। গরুর পেছন থেকে তাকালে বাম দিকটা উঁচু ঢিবির মতো দেখায়।
- খাওয়া ও জাবর কাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- অস্থিরতা: ঘন ঘন ওঠা-বসা, পেটের দিকে লাথি মারা, পিঠ বাঁকিয়ে দাঁড়ানো।
- মুখ দিয়ে লালা পড়া।
- শেষ ধাপে শ্বাসকষ্ট: হা করে জিভ বের করে শ্বাস নেওয়া। এটা দেখলে বুঝবেন হাতে সময় খুবই কম।
চিকিৎসক আসার আগে যা করবেন, যা করবেন না
করবেন
- সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক বা প্রাণিসম্পদ অফিসে ফোন করুন। ফোনে লক্ষণ বলুন, তারা করণীয় বলে দেবেন।
- সব খাবার ও পানি সরিয়ে ফেলুন, যেন আর কিছু পেটে না যায়।
- গরুকে শুতে না দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটাতে থাকুন। হাঁটলে অনেক সময় গ্যাস বেরোনোর পথ খুলে যায়।
- কী খেয়েছিল মনে করে রাখুন (কচি ঘাস, নতুন দানাদার, ভাত-ফ্যান)। চিকিৎসকের কাজে লাগবে।
করবেন না
- নিজে থেকে কোনো ওষুধ, কেরোসিন, সোডা বা তেল খাওয়াবেন না। কোনটা কোন ধরনের ব্লোটে চলে তা পরীক্ষা ছাড়া বলা যায় না, ভুলটা প্রাণঘাতী।
- পেট ফুটো করার (ট্রোকার) চেষ্টা কখনোই নিজে করবেন না।
- "দেখি সকাল পর্যন্ত কী হয়" বলে ফেলে রাখবেন না। বাড়াবাড়ি ব্লোটে কয়েক ঘণ্টাতেই গরু মারা যেতে পারে।
পেট ফাঁপা কেন হয়
বেশিরভাগ পেট ফাঁপার পেছনে থাকে খাওয়ানোর ভুল, রোগ নয়। সাধারণ কারণগুলো:
- খালি পেটে হঠাৎ অনেকখানি কচি, ভেজা বা শিশিরভেজা ঘাস। বর্ষায় এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, বিস্তারিত বর্ষার খাদ্য গাইডে।
- হঠাৎ খাদ্য বদলানো: আজ খড়, কাল থেকেই পুরো নতুন রেশন। গরুর পাকস্থলীর জীবাণুরা নতুন খাবারে মানিয়ে নিতে সময় নেয়।
- একবারে বেশি দানাদার বা ভাত-ফ্যান জাতীয় খাবার।
- নষ্ট, ছত্রাক ধরা বা পচা খাবার। সাইলেজ ভালো আছে কি না যাচাইয়ের নিয়ম এই গাইডে।
- খাদ্যনালিতে আলু, কাঁচা কাঁঠাল বা বড় টুকরা আটকে যাওয়া, তখন ঢেকুরের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রতিরোধ: যে নিয়মগুলো মানলে পেট ফাঁপা আসেই না
- যেকোনো নতুন খাবার ৭ দিনে অভ্যাস করান। অল্প দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে বাড়ান। সাইলেজের জন্য ধাপে ধাপে নিয়মটা এখানে লেখা আছে।
- কচি ঘাসের আগে শুকনো কিছু দিন। খালি পেটে ভেজা কচি ঘাস নয়, আগে খড় বা সাইলেজ দিয়ে পেটে ভিত বানিয়ে নিন।
- দানাদার ভাগ করে দিন। দিনের মোট দানাদার ২-৩ বারে ভাগ করে খাওয়ান, একবারে নয়।
- প্রতিদিন একই সময়ে খাওয়ান। নিয়মিত রুটিনে গরুর হজম সবচেয়ে ভালো চলে। ছাপানো রুটিন গোয়ালে টানাতে ফ্রি খাদ্য তালিকা চার্ট ব্যবহার করুন।
- সন্দেহজনক খাবার ফেলে দিন। ভাপসা গন্ধ, ছত্রাকের দাগ বা পচা অংশ থাকলে সেই খাবার কোনো পশুকেই নয়।
এখানে সাইলেজের একটা সুবিধার কথা না বললেই নয়। খামারভেস্ট সাইলেজ প্রতিদিন একই মানের খাবার দেয় বলে হঠাৎ খাদ্য বদলের ঝুঁকিটাই কমে যায়: আজ এক জমির ঘাস, কাল আরেক জমির, পরশু খড়, এই অনিয়মটা আর থাকে না। এয়ারটাইট বস্তার খাবারে কাদা বা বৃষ্টিতে ভেজারও সুযোগ নেই। শুধু দুটো নিয়ম মানবেন: নতুন গরুকে ৭ দিনে অভ্যাস করানো, আর বস্তা খোলার পর ২-৩ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
গরুর স্বাস্থ্য, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খামারিদের অভিজ্ঞতার নিয়মিত পরামর্শ পেতে ফেসবুকে যুক্ত থাকুন।