আজকের বাছুরই আগামী দিনের দুধের গাভী বা মোটাতাজাকরণের ষাঁড়। অথচ খামারে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু আর সবচেয়ে বেশি অবহেলা হয় ঠিক এই বয়সেই। ভালো খবর হলো, বাছুর পালনের বেশিরভাগ ক্ষতি ঠেকাতে দামি কিছু লাগে না। প্রথম কয়েক ঘণ্টার যত্ন, পরিষ্কার একটা শুকনো জায়গা আর বয়স অনুযায়ী সঠিক খাবার, এই তিনটাই মূল কথা।
এই লেখায় একটা কথা আমরা পরিষ্কার করে বলব, যেটা খাদ্য বিক্রেতার মুখে সাধারণত শোনা যায় না: খুব ছোট বাছুরকে সাইলেজ দেওয়া যায় না। খামারভেস্ট সাইলেজ আমরা নিজেরাই সরবরাহ করি, তবু এই সীমাটা বলে দেওয়া দরকার, কারণ ভুল বয়সে দিলে বাছুরের ক্ষতি হয় আর খামারির টাকাও নষ্ট হয়।
জরুরি বিষয়
নবজাতক বাছুরের সবচেয়ে জরুরি কাজ শাল দুধ (কোলস্ট্রাম), যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। বাছুর দাঁড়াতে না পারলে বা দুধ টানতে না পারলে দেরি না করে ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জানান। এই লেখার পরিমাণ ও সময় সাধারণ নির্দেশনা, আপনার বাছুরের ওজন ও অবস্থা অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ স্থানীয় পশু চিকিৎসকই বলতে পারবেন।
জন্মের প্রথম দিন: যা করতেই হবে
- শ্বাস ও নাক-মুখ পরিষ্কার: জন্মের পরপর নাক ও মুখের আঠালো পদার্থ পরিষ্কার করে দিন, যেন শ্বাস নিতে কষ্ট না হয়।
- শাল দুধ: যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আদর্শ প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে, কোনোভাবেই যেন ছয় ঘণ্টা পার না হয়। শাল দুধই বাছুরের প্রথম টিকা, এর বিকল্প নেই।
- নাভির যত্ন: নাভির গোড়ায় জীবাণুনাশক লাগানোর নিয়ম আছে। কোন ওষুধ ও কীভাবে, তা চিকিৎসকের পরামর্শে করুন। নাভি দিয়েই বেশিরভাগ সংক্রমণ ঢোকে।
- শুকনো, নরম জায়গা: ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বাছুর রাখবেন না। শুকনো খড় বিছিয়ে দিন, বাতাস লাগুক কিন্তু সরাসরি ঠান্ডা হাওয়া নয়।
শাল দুধ কেন এত জরুরি
বাছুর জন্মায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় শূন্য নিয়ে। মায়ের প্রথম দুধে (শাল দুধ) সেই প্রতিরোধের উপাদান থাকে, আর বাছুরের অন্ত্র সেগুলো শোষণ করতে পারে জন্মের পরের অল্প কয়েক ঘণ্টাই। সময় পেরিয়ে গেলে একই দুধ খাওয়ালেও আর আগের মতো কাজ হয় না। এজন্যই সময়টা এত গুরুত্বপূর্ণ।
মা মারা গেলে বা দুধ না থাকলে, একই খামারের অন্য সদ্য বিয়ানো গাভীর শাল দুধ ব্যবহারের প্রচলন আছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দুধ খাওয়ানোর সময় ও পরিচ্ছন্নতা
প্রথম মাসগুলোতে দুধই বাছুরের মূল খাবার। দৈনিক পরিমাণ ঠিক হয় বাছুরের ওজন অনুযায়ী, তাই একটা সাধারণ সংখ্যা সবার জন্য খাটে না। আপনার বাছুরের ওজন ধরে সঠিক পরিমাণ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন। যে নিয়মগুলো সবার জন্যই এক:
- প্রতিদিন একই সময়ে, ভাগ করে খাওয়ান। একবারে বেশি দুধ পেটের সমস্যা তৈরি করে।
- বালতি বা পাত্র প্রতিবার ধুয়ে শুকিয়ে নিন। নোংরা পাত্রই বাছুরের পাতলা পায়খানার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
- ঠান্ডা নয়, স্বাভাবিক উষ্ণতার দুধ দিন।
- প্রথম সপ্তাহ থেকেই আলাদা পাত্রে পরিষ্কার পানি সামনে রাখুন। অনেকে ভাবেন দুধ খাচ্ছে তাই পানি লাগবে না, এটা ভুল। পানি ছাড়া রুমেন ঠিকমতো গড়ে ওঠে না।
বাছুরের পাতলা পায়খানা শুরু হলে হালকাভাবে নেবেন না। ছোট বাছুরে পানিশূন্যতা খুব দ্রুত বিপদ ডেকে আনে, তাই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রুমেন গড়ে ওঠা: এখানেই আসল খেলা
এই অংশটা বুঝলে বাকি সব সিদ্ধান্ত সহজ হয়ে যায়। বড় গরু ঘাস আর আঁশজাতীয় খাবার হজম করে রুমেনের (পাকস্থলীর বড় প্রকোষ্ঠ) ভেতরের অসংখ্য উপকারী জীবাণুর সাহায্যে। কিন্তু বাছুর জন্মায় কার্যত অকার্যকর রুমেন নিয়ে, তখন সে অনেকটা এক পাকস্থলীর প্রাণীর মতোই দুধ হজম করে।
রুমেন গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে, আর তাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে অল্প পরিমাণে শক্ত দানাদার খাবার আর পানি। এজন্যই প্রথম সপ্তাহ থেকেই সামনে সামান্য নরম দানাদার (কাফ স্টার্টার) রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রথম দিকে বাছুর মুখে নেবে আর ফেলে দেবে, তাতে অসুবিধা নেই, এই অভ্যাসটাই কাজে লাগে।
কখন থেকে ঘাস ও সাইলেজ দেওয়া যায়
সোজা উত্তর: খুব ছোট বাছুরকে সাইলেজ নয়। রুমেন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আঁশজাতীয় ভারী খাবার হজম হয় না, পেট ভরে যায় অথচ পুষ্টি মেলে না, আর হজমের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সাধারণ ধারা এমন: প্রথম দিকে দুধ ও অল্প দানাদার, এরপর অল্প করে নরম শুকনো খড় বা ভালো ঘাস, তারপর দুধ ছাড়ানোর ধাপ (সাধারণত তিন মাসের কাছাকাছি, বাছুর কতটা দানাদার খাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে), আর তারপরই খুব অল্প পরিমাণে ভালো মানের সাইলেজ দিয়ে শুরু। এরপর বয়স ও ওজনের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ে, এবং বড় গরুর পূর্ণ পরিমাণে পৌঁছায় আরও পরে।
সাইলেজ শুরু করার সময় দুটো নিয়ম কড়াভাবে মানবেন। এক, একদিনেই বেশি নয়, খুব অল্প দিয়ে শুরু করে সপ্তাহখানেক ধরে বাড়ান, নিয়মটা প্রথমবার খাওয়ানোর গাইডে লেখা আছে। দুই, বাছুরকে কেবল টাটকা, ভালো মানের সাইলেজই দিন। বড় গরু যেটুকু সামলে নিতে পারে, ছোট বাছুর তা পারে না, তাই সামান্য সন্দেহ হলেও নষ্ট সাইলেজ চেনার লক্ষণ মিলিয়ে দেখে তবেই দিন।
আপনার বাছুরের বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থা দেখে সঠিক সময় ও পরিমাণ ঠিক করবেন ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। বইয়ের সংখ্যার চেয়ে আপনার নিজের বাছুরকে দেখে নেওয়া পরামর্শ সবসময় ভালো।
টিকা, কৃমি ও নিয়মিত নজর
বাছুরের টিকা ও কৃমিনাশকের সময়সূচি এলাকা ও রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী আলাদা হয়, তাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে সময়সূচি নিয়ে নিন, সেটা বিনামূল্যেই পাওয়া যায়। কাকে কবে কী দেওয়া হলো তা লিখে রাখলে পরের বার আন্দাজে চলতে হয় না, এজন্য আমাদের ফ্রি টিকা ও কৃমিনাশক রেকর্ড শিট প্রিন্ট করে গোয়ালে টানিয়ে রাখতে পারেন।
প্রতিদিন অল্প সময় বাছুরের দিকে তাকান। কান ঝুলে পড়া, চোখ বসে যাওয়া, খেতে অনাগ্রহ, ঝিমানো বা পাতলা পায়খানা, এর যেকোনোটি দেখলে অপেক্ষা করবেন না।
যে ভুলগুলো বারবার দেখা যায়
- শাল দুধে দেরি: সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভুল, আর এটি আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
- নোংরা পাত্র: দুধ ভালো, পাত্র নোংরা, ফল পাতলা পায়খানা।
- বয়সের আগেই ভারী আঁশ: রুমেন তৈরির আগেই সাইলেজ বা মোটা খড় দেওয়া।
- পানি না দেওয়া: দুধ খাচ্ছে বলে পানি লাগবে না, এই ধারণাটাই রুমেন গড়ে ওঠা পিছিয়ে দেয়।
- ভেজা মেঝে: স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখা বাছুর বারবার অসুস্থ হয়।
বাছুর বড় হয়ে দুধে এলে বা মোটাতাজাকরণে গেলে খাদ্যের হিসাব বদলে যায়। সেই ধাপের জন্য গাভীর দুধ বাড়ানোর গাইড আর মোটাতাজাকরণের খাদ্য তালিকা দেখে নিন। বড় পশুর দৈনিক পরিমাণ (দুধের গাভী ১৫-২৫ কেজি, মোটাতাজাকরণে ১০-২০ কেজি সাইলেজ) আর কত বস্তা লাগবে তা হোমপেজের ক্যালকুলেটরে হিসাব করতে পারবেন। খামারভেস্ট সাইলেজ ৫০ কেজির এয়ারটাইট বস্তায় সারাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পৌঁছায়, দাম প্রতি কেজি ১০ টাকা।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
বাছুর পালন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খামারিদের অভিজ্ঞতার নিয়মিত পরামর্শ পেতে ফেসবুকে যুক্ত থাকুন।