
ভালো খাবার দিলেই গরু সুস্থ থাকে না। খাদ্য, টিকা ও কৃমিনাশক তিনটি মিলিয়ে যত্ন সম্পূর্ণ হয়। খাদ্যের হিসাব রোজকার কাজ বলে মনে থাকে, কিন্তু টিকা বছরে একবার-দুইবার বলে ভুলে যাওয়া সহজ, অথচ একটা রোগ এসে গেলে পুরো মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এই তালিকা কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ বা সরকারি প্রেসক্রিপশন নয়, সাধারণ সময়সূচি মাত্র। ঠিক কোন ভ্যাকসিন, কোন ডোজ ও কবে, তা সবসময় আপনার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা পশুচিকিৎসকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন, কারণ সরবরাহ ও এলাকার রোগের ইতিহাস অনুযায়ী তা বদলায়।
জরুরি বিষয়
এটি চিকিৎসা পরামর্শ নয়। অসুস্থ বা দুর্বল গরুকে টিকা দেওয়ার আগে পশুচিকিৎসকের মত নিন। ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা ও নির্দিষ্ট সময়সূচি এলাকাভেদে বদলায়, তাই নিচের তালিকাকে দিক-নির্দেশনা হিসেবে ব্যবহার করুন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
টিকার সাধারণ সময়সূচি
দক্ষিণ এশীয় দুগ্ধ খামারের জন্য প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী চারটি প্রধান রোগের টিকার সময়:
| রোগ | প্রথম টিকা | বুস্টার | পরে কত দিন পরপর |
|---|---|---|---|
| ক্ষুরা রোগ (FMD) | ৪ মাস বয়স থেকে | ১ মাস পর | প্রতি ৬ মাস পরপর |
| তড়কা (অ্যানথ্রাক্স) | ৪ মাস বয়স থেকে | নেই | এলাকায় রোগের ইতিহাস থাকলে বছরে একবার |
| গলাফুলা (ব্ল্যাক কোয়ার্টার) | ৬ মাস বয়স থেকে | নেই | এলাকায় রোগের ইতিহাস থাকলে বছরে একবার |
| বাদলা (হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়া) | ৬ মাস বয়স থেকে | নেই | এলাকায় রোগের ইতিহাস থাকলে বছরে একবার |
"এলাকায় রোগের ইতিহাস থাকলে" কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। তড়কা, গলাফুলা ও বাদলা সব এলাকায় সমানভাবে দেখা যায় না, তাই আপনার উপজেলায় গত কয়েক বছরে এই রোগ হয়েছে কি না তা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে জিজ্ঞেস করে তবেই ঠিক করুন কোনটা জরুরি। ক্ষুরা রোগের ঝুঁকি ও লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আছে গরুর ক্ষুরা রোগ (FMD) লেখায়।
কৃমিনাশকের সাধারণ নিয়ম
কৃমির চাপ মাটি, ঘাস চরার ধরন ও ঋতুর ওপর নির্ভর করে বলে টিকার মতো একটাই নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। তবু কিছু সাধারণ দিক-নির্দেশনা কাজে লাগে:
- বাছুর: কয়েক মাস বয়স থেকে প্রথম কৃমিনাশক, এরপর দুধ ছাড়ানোর সময় আবার। ছোট বাছুরের কৃমির চাপ বেশি সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে, তাই দেরি না করাই ভালো।
- বড় হতে থাকা ও বয়স্ক গরু: সাধারণত বছরে দুই থেকে চারবার, মাঠে চরে বেড়ানো বা বর্ষার সময় বেশি ঘন ঘন, কারণ ভেজা মাটি ও কাদায় পরজীবীর ডিম বেশি ছড়ায়।
- একই ওষুধ বারবার নয়: একই কৃমিনাশক বারবার ব্যবহার করলে কৃমির মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে, তাই মাঝেমধ্যে ওষুধ বদলানোর ব্যাপারে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বর্ষায় ভেজা ঘাস ও কাদাযুক্ত মাঠে চরানো পরজীবীর অন্যতম বড় উৎস। বর্ষার খাদ্য ব্যবস্থাপনার সাধারণ নিয়ম আছে বর্ষাকালে গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনা লেখায়।
কেন সময়মতো টিকা এত জরুরি
শুধু গরুটির অসুস্থতা নয়, হিসাবটা আর্থিকও। বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH)-এর তথ্য অনুযায়ী ক্ষুরা রোগে দীর্ঘমেয়াদি আক্রান্ত গরুর দুধ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, আর বাছুরের মৃত্যুহার প্রাপ্তবয়স্ক গরুর চেয়ে অনেক বেশি। একটি ডোজের খরচ, রোগ হয়ে গেলে দুধ ও ওজনের যে ক্ষতি হয় তার তুলনায় সবসময়ই কম। এই হিসাব খাদ্য খরচের মতোই, ছোট নিয়মিত খরচ বড় ক্ষতি ঠেকায়।
টিকা নির্দিষ্ট রোগ ঠেকায়, খাদ্য সেই কাজ করে না। তবে পুষ্টির ঘাটতি শরীরকে দুর্বল করে, আর হঠাৎ খাদ্য বদল নিজেই হজমের গোলমালের একটা কারণ। খামারভেস্ট সাইলেজের মতো বস্তার খাবার আগে থেকে রাখা থাকলে ঘাসের ঘাটতির মাসেও রেশন হঠাৎ বদলাতে হয় না, সেটুকুই খাদ্যের ভূমিকা।
রেকর্ড রাখার নিয়ম
তারিখ মনে রাখার জিনিস নয়, লেখার জিনিস। বেশি পশু থাকলে কোন গরুকে কবে কী দেওয়া হয়েছে মনে রাখা প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি গরুর জন্য এই তথ্য লিখে রাখুন:
- কোন টিকা বা কৃমিনাশক দেওয়া হয়েছে এবং কোন তারিখে
- পরবর্তী ডোজ কবে দিতে হবে, আগে থেকেই লিখে রাখুন যাতে ভুলে না যান
- কে দিয়েছেন (নিজে না প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা), যাতে পরে প্রশ্ন উঠলে জানা থাকে
এই কাজের জন্য প্রিন্ট করার মতো একটি ফ্রি শিট আছে, টিকা ও কৃমিনাশকের রেকর্ড শিট, যেখানে প্রতিটি গরুর সারিতে তারিখ লিখে রাখা যায়।
টিকা কোথায় পাওয়া যায়
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে সরকারি কর্মসূচির আওতায় অনেক টিকা বিনামূল্যে বা কম খরচে পাওয়া যায়। কোন টিকা এই মুহূর্তে সরবরাহে আছে, বয়স ও ডোজ কী হবে তা সরাসরি সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ, কারণ সরবরাহ ও কর্মসূচি এলাকাভেদে এবং সময়ভেদে বদলায়। নতুন খামার শুরু করলে প্রথম মাসেই স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে রাখা ভালো, যার প্রস্তুতির অন্যান্য ধাপ আছে গরুর খামার শুরু করার উপায় লেখায়।
তথ্যসূত্র
সাধারণ প্রশ্ন
গরুর ক্ষুরা রোগের টিকা কোন বয়সে দিতে হয়?
সাধারণ নিয়ম হলো ৪ মাস বয়স থেকে প্রথম ডোজ, এক মাস পর বুস্টার, তারপর প্রতি ৬ মাস পরপর আবার দিতে হয়, কারণ একটি ডোজ মাত্র কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়। এই সময়সূচি দক্ষিণ এশীয় দুগ্ধ উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ নির্দেশনা থেকে নেওয়া। এলাকায় কোন ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে এবং ঠিক কবে দেওয়া উচিত তা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত করে নিন।
গরুকে কোন কোন টিকা দিতে হয়?
বাংলাদেশে গরুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি টিকা: ক্ষুরা রোগ (FMD), তড়কা বা অ্যানথ্রাক্স, গলাফুলা বা ব্ল্যাক কোয়ার্টার এবং বাদলা বা হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়া। শেষ তিনটি সাধারণত ৪-৬ মাস বয়স থেকে শুরু হয় এবং যেসব এলাকায় রোগ দেখা যায় সেখানে বছরে একবার বুস্টার লাগে। কোন টিকা আপনার এলাকায় জরুরি তা স্থানীয় রোগের ইতিহাস অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ঠিক করে দেবেন।
গরুকে কত দিন পরপর কৃমিনাশক দিতে হয়?
সাধারণ নিয়ম হিসেবে বাছুরকে কয়েক মাস বয়স থেকে প্রথম কৃমিনাশক দেওয়া হয়, এরপর বড় হতে থাকা ও বয়স্ক গরুকে বছরে দুই থেকে চারবার, বর্ষা ও মাঠে চরে বেড়ানোর সময় বেশি ঘন ঘন। ঠিক কত দিন পরপর এবং কোন ওষুধ, তা কৃমির চাপ ও এলাকার পরিস্থিতি অনুযায়ী পশুচিকিৎসক ঠিক করবেন, কারণ একই ওষুধ বারবার দিলে কৃমির মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
টিকা ও কৃমিনাশক কোথায় পাওয়া যায়?
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে সরকারি কর্মসূচির আওতায় অনেক টিকা বিনামূল্যে বা কম খরচে দেওয়া হয়। কোন টিকা এই মুহূর্তে সরবরাহে আছে, বয়স ও ডোজ কী হবে তা সরাসরি সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ, কারণ সরবরাহ ও কর্মসূচি এলাকাভেদে ও সময়ভেদে বদলায়।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
খামার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়মিত গাইড পেতে পেজে যুক্ত থাকুন।
পরের ধাপ: সাইলেজ নিতে চাইলে
খামারভেস্ট সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা। আগে টাকা নয়, বস্তা হাতে পেয়ে টাকা; পরিবহন খরচ কনফার্মেশন কলে জানানো হয়।
সম্পর্কিত গাইড
সাইলেজ কেনার আগে
আপনার জেলায় সাইলেজ: দাম ও ডেলিভারি
জেলা বেছে নিন, সেখানে কীভাবে অর্ডার ও ডেলিভারি হয় দেখে নিন।