শীতকালে খাবারের অভাব সবাই বোঝেন, কিন্তু বর্ষার সমস্যাটা অন্যরকম। খাবার আছে, তবে সেই খাবারই গরুকে অসুস্থ করে দিতে পারে। বৃষ্টিতে ভেজা ঘাস, কাদামাখা মাঠ, স্যাঁতসেঁতে খড়, জমা পানি, সব মিলিয়ে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস খামারির জন্য সাবধানে চলার সময়।
এই মৌসুমে খামারভেস্ট সাইলেজের মতো এয়ারটাইট বস্তার খাবার একটা নির্দিষ্ট কারণে কাজে আসে: সেলাই করা বস্তা অক্ষত থাকলে বৃষ্টির পানি আর মাঠের কাদা ভেতরে পৌঁছায় না, আর বর্ষার ভেজা নিচু জমি থেকে প্রতিদিন ঘাস কেটে আনতে হয় না বলে সেই ঘাসের সাথে কৃমির লার্ভা পেটে যাওয়ার একটা পথ কমে। কেন এবং কীভাবে, তা নিচে ধাপে ধাপে বলছি।
জরুরি বিষয়
বৃষ্টিতে ভেজা কচি ঘাস খালি পেটে বেশি খাওয়ালে পেট ফাঁপার (ব্লোট) ঝুঁকি থাকে। পেট হঠাৎ ফুলে গেলে, গরু অস্থির হলে বা মুখ দিয়ে লালা পড়লে দেরি না করে ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করুন। এটি ফেলে রাখার মতো সমস্যা নয়।
বর্ষায় গরুর সমস্যাগুলো আসলে কোথা থেকে আসে
বর্ষার সমস্যাগুলোর মূল উৎস তিনটি। প্রথমত, ভেজা কচি ঘাসে পানির ভাগ অনেক বেশি। গরু পেট ভরে খেলেও শুকনো খাদ্য (ড্রাই ম্যাটার) কম পায়, ফলে দুধ কমে যায় অথচ পেট ভরা দেখায়। দ্বিতীয়ত, কাদা ও জমা পানিতে কৃমির ডিম আর লার্ভা ছড়ায়। নিচু জমির ঘাসের সঙ্গে সেগুলো গরুর পেটে যায়। তৃতীয়ত, ঘরে রাখা খড় ও দানাদার খাবার আর্দ্র বাতাসে স্যাঁতসেঁতে হয়ে ছত্রাক ধরে, আর ছত্রাক ধরা খাবার গরুর জন্য বিষের মতো।
এই তিনটি জিনিস চিনে রাখলে সমাধানও পরিষ্কার হয়ে যায়: ঘাস দেওয়ার নিয়ম বদলানো, ভেজা মৌসুমে খাবার শুকনো রাখা, আর যে খাবারে ঝুঁকি কম সেটির ভাগ বাড়ানো।
ভেজা ঘাস দেওয়ার নিরাপদ নিয়ম
বর্ষায় কাঁচা ঘাস একেবারে বাদ দিতে হবে না, নিয়ম মেনে দিলেই চলে।
- ঘাস কেটে সরাসরি না দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ছায়ায় ছড়িয়ে রাখুন, যেন উপরের পানি ঝরে যায়।
- খালি পেটে শুধু কচি ঘাস দেবেন না। আগে অল্প খড় বা সাইলেজ দিন, তারপর ঘাস দিন। এতে পেট ফাঁপার ঝুঁকি কমে।
- নিচু, জলাবদ্ধ বা কাদাভরা জমির ঘাস এড়িয়ে চলুন। কৃমির ঝুঁকি সেখানেই সবচেয়ে বেশি।
- মাটির একেবারে গোড়া ঘেঁষে ঘাস কাটবেন না। গোড়ার দিকেই কাদা ও লার্ভা লেগে থাকে।
- একবারে অনেক ঘাস কেটে জমিয়ে রাখবেন না। ভেজা ঘাস স্তূপ করে রাখলে দ্রুত গরম হয়ে নষ্ট হয়।
বর্ষার নিরাপদ খাদ্য তালিকা
ভেজা মৌসুমে লক্ষ্য একটাই: পেট ভরানো নয়, শুকনো খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা। সাইলেজ এখানে কাজে আসে, কারণ এটি এয়ারটাইট বস্তায় ফার্মেন্ট করা খাবার: বস্তা অক্ষত থাকলে বৃষ্টি বা বাইরের আর্দ্রতা ভেতরে ঢোকে না, আর এতে শুকনা পদার্থ ভেজা কচি ঘাসের চেয়ে বেশি। একটি সাধারণ দৈনিক ভাগ এমন হতে পারে:
দুধের গাভী
- সাইলেজ: ১৫-২৫ কেজি (সাধারণত ২০ কেজি)
- শুকনো খড়: ২-৩ কেজি
- দানাদার: দুধের পরিমাণ অনুযায়ী, স্থানীয় পরামর্শ মেনে
- পরিষ্কার পানি: সবসময়, জমা বা ডোবার পানি নয়
মোটাতাজাকরণের গরু
- সাইলেজ: ১০-২০ কেজি (সাধারণত ১৫ কেজি)
- শুকনো খড়: ১-২ কেজি
- দানাদার: ওজন ও লক্ষ্য অনুযায়ী
ছাগল ও ভেড়া
- সাইলেজ: ১-২ কেজি
- শুকনো খড় ও পাতা: অল্প পরিমাণে
পরিমাণের বিস্তারিত হিসাব চাইলে ওজন অনুযায়ী সাইলেজ খাওয়ানোর হিসাব গাইডটি দেখুন। আর গরু আগে কখনো সাইলেজ না খেয়ে থাকলে প্রথমবার খাওয়ানোর নিয়ম মেনে ৭ দিনে ধীরে অভ্যাস করান।
খড় ও দানাদার শুকনো রাখার নিয়ম
বর্ষায় সবচেয়ে বেশি টাকা নষ্ট হয় ভেজা খড়ে। কয়েকটি সহজ নিয়ম মানলেই এই ক্ষতি ঠেকানো যায়।
- খড় মাটিতে নয়, বাঁশের মাচা বা ইটের উপর রাখুন, যেন নিচ থেকে ভিজে না ওঠে।
- উপরে টিন বা পলিথিনের ছাউনি দিন, তবে চারপাশ পুরো আটকে দেবেন না। বাতাস চলাচল না থাকলে ভেতরে ভাপ জমে।
- দানাদার খাবার বায়ুরোধী ড্রাম বা ঢাকনাওয়ালা পাত্রে রাখুন। বস্তায় রাখলে দেয়াল থেকে দূরে রাখুন।
- কালো বা সাদা ছত্রাকের দাগ, ভাপসা গন্ধ বা জমাট বাঁধা খাবার গরুকে দেবেন না। ফেলে দেওয়ার কষ্ট চিকিৎসার খরচের চেয়ে কম।
সাইলেজের বস্তা এদিক থেকে সুবিধার: না-খোলা এয়ারটাইট বস্তা ৬-১২ মাস ভালো থাকে, আর বস্তা ছেঁড়া বা ফুটো না হলে বর্ষার আর্দ্রতা ভেতরে ঢোকে না। বস্তা পাটাতনের উপর, মেঝের পানি থেকে উঁচুতে রাখুন। শুধু খোলার পর ২-৩ দিনের মধ্যে ব্যবহার করবেন। বস্তার সাইলেজ ভালো আছে কি না যাচাই করতে নষ্ট সাইলেজ চেনার ৭টি লক্ষণ দেখে নিন।
কৃমি ও রোগ থেকে বাঁচার প্রস্তুতি
খাদ্যের নিয়ম মানার পাশাপাশি বর্ষায় কয়েকটি বাড়তি সতর্কতা দরকার। গোয়ালের মেঝে যতটা সম্ভব শুকনো রাখুন, কাদা জমতে দেবেন না। বর্ষার শুরুতে ও শেষে প্রাণিসম্পদ অফিস বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কৃমিনাশক দিন, নিজে থেকে ওষুধ বা মাত্রা ঠিক করবেন না। টিকা ও কৃমিনাশকের হিসাব রাখতে আমাদের ফ্রি টিকা ও কৃমিনাশক রেকর্ড শিট প্রিন্ট করে গোয়ালে টানিয়ে রাখতে পারেন।
পানির বিষয়টিও খাবারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষায় চারদিকে পানি থাকলেও গরুকে ডোবা বা জমা পানি খেতে দেবেন না। নলকূপ বা পরিষ্কার উৎসের পানি আলাদা পাত্রে দিন।
বর্ষার খাবারের খরচটাও হিসাবে রাখুন
খামারভেস্ট সাইলেজের দাম সারা বছর একই: প্রতি কেজি ৮.৫০ টাকা, ৫০ কেজির এয়ারটাইট বস্তা ৪২৫ টাকা, সারাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি। তুলনা করার সময় শুধু কেজির দাম নয়, বর্ষায় ঘাস কাটার লোকের মজুরি আর ভেজা খড় ফেলে দেওয়ার ক্ষতিও নিজের খামারের হিসাবে ধরুন। আপনার খামারে মাসে কত বস্তা লাগবে তা হোমপেজের ক্যালকুলেটরে এক মিনিটে বের করতে পারবেন।
সাধারণ প্রশ্ন
বর্ষায় ভেজা কাঁচা ঘাস গরুকে খাওয়ানো যাবে কি?
বৃষ্টিতে ভেজা ঘাস সরাসরি বেশি পরিমাণে খাওয়ালে পেট ফাঁপার (ব্লোট) ঝুঁকি বাড়ে। ঘাস কেটে কয়েক ঘণ্টা ছায়ায় রেখে পানি ঝরিয়ে অল্প অল্প করে দিন, সঙ্গে শুকনো খড় বা সাইলেজ মিশিয়ে দিলে ঝুঁকি কমে।
বর্ষাকালে গরুর কৃমি কেন বাড়ে?
কাদা, জমা পানি ও নিচু জমির ঘাসে কৃমির ডিম ও লার্ভা বেশি থাকে। বর্ষার শুরুতে ও শেষে প্রাণিসম্পদ অফিস বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কৃমিনাশক দিন এবং নিচু জলাবদ্ধ জমির ঘাস এড়িয়ে চলুন।
বর্ষায় গরুর নিরাপদ খাবার কোনটি?
না-খোলা এয়ারটাইট বস্তা বৃষ্টি, কাদা ও বাইরের আর্দ্রতা আটকে রাখে, তাই বস্তা ছেঁড়া বা ফুটো না থাকলে ভেতরের সাইলেজ ভেজে না এবং মাঠের কাদার সংস্পর্শে আসে না। খোলার পর ২-৩ দিনের মধ্যে শেষ করুন। দুধের গাভীকে দৈনিক ১৫-২৫ কেজি সাইলেজ, সঙ্গে শুকনো খড় ও দানাদার দিন।
বর্ষায় খড় স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে কী করব?
স্যাঁতসেঁতে বা ছত্রাক ধরা খড় গরুকে দেবেন না। খড় মাটি থেকে উঁচু মাচায়, পলিথিন বা টিনের নিচে রাখুন। কালো বা সাদা ছত্রাকের দাগ ও ভাপসা গন্ধ থাকা খড় ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
মৌসুম অনুযায়ী খামার পরিচালনার পরামর্শ, সাইলেজ স্টক আপডেট পেতে ফেসবুকে যুক্ত থাকুন।
পরের ধাপ: সাইলেজ নিতে চাইলে
খামারভেস্ট সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা। আগে টাকা নয়, বস্তা হাতে পেয়ে টাকা; পরিবহন খরচ কনফার্মেশন কলে জানানো হয়।
সম্পর্কিত গাইড
সাইলেজ কেনার আগে
আপনার জেলায় সাইলেজ: দাম ও ডেলিভারি
জেলা বেছে নিন, সেখানে কীভাবে অর্ডার ও ডেলিভারি হয় দেখে নিন।