বাংলাদেশে গরম আর আর্দ্রতা দুটোই বেশি, আর গরু ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা করতে পারে না। তাই তাপমাত্রা বাড়লে গরুর শরীরের ভেতরের তাপ বেরোতে পারে না, গরু হাঁপাতে শুরু করে আর সবার আগে যেটা কমায়, সেটা খাওয়া। খাওয়া কমলে দুধ কমে, মোটাতাজাকরণের গরুর বাড়ন্ত থেমে যায়। মজার বিষয়, বেশিরভাগ খামারি তখন খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ করেন, অথচ সমস্যাটা খাবারে নয়, গরমে।
ভালো খবর হলো, গরমের ক্ষতির বড় অংশ ঠেকানো যায় শুধু কয়েকটা রুটিন বদলে: কখন খাওয়াচ্ছেন, পানি কোথায় রাখছেন, আর দুপুরে গরু কোথায় থাকছে। এর সঙ্গে খাবারের মান একই রাখা জরুরি, আর এখানেই খামারভেস্ট সাইলেজের মতো বস্তাবন্দি খাবার সুবিধা দেয়, কারণ গরমে ঘাসের জোগান আর মান দুটোই ওঠানামা করে।
জরুরি বিষয়
গরু মুখ খুলে জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে, ঘাড় লম্বা করে দাঁড়িয়ে আছে, টলছে বা দাঁড়াতে পারছে না, এমন হলে এটি জরুরি অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে ছায়ায় নিন, গায়ে পানি দিন, বাতাসের ব্যবস্থা করুন এবং দেরি না করে ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে ফোন করুন। গর্ভবতী গাভী ও বেশি দুধ দেওয়া গাভী গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
হিট স্ট্রেস কীভাবে চিনবেন
গরমের ক্ষতি ধীরে ধীরে হয়, তাই লক্ষণ চেনা না থাকলে বোঝাই যায় না। এগুলো খেয়াল করুন:
- ঘন ঘন হাঁপানো, শ্বাস দ্রুত হয়ে যাওয়া। বাড়াবাড়ি হলে মুখ খুলে বা জিভ বের করে শ্বাস নেওয়া।
- ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা, শুতে না চাওয়া (দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের তাপ বেশি বেরোয়)।
- খাবারের পাত্রে আগ্রহ কমে যাওয়া, বিশেষ করে দুপুরে। জাবর কাটাও কমে যায়।
- স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পানি খাওয়া।
- দুধ কমে যাওয়া, আর গাভীর গরমে আসার লক্ষণ (হিট) কম স্পষ্ট হওয়া, ফলে প্রজননও পিছিয়ে যায়।
সন্দেহ হলে সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা: দুপুরে গোয়ালে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখুন কতগুলো গরু হাঁপাচ্ছে আর কতগুলো শুয়ে আছে। বেশিরভাগ দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকলে ধরে নিন গরম তাদের কষ্ট দিচ্ছে।
গরমে দুধ কমে যায় কেন
তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। এক, গরু খাওয়া কমিয়ে দেয়, তাই শক্তি কম আসে। দুই, শরীর ঠান্ডা রাখতেই (হাঁপানো, রক্ত চলাচল বাড়ানো) শক্তির একটা বড় অংশ খরচ হয়ে যায়, দুধের জন্য কম থাকে। তিন, জাবর কাটা কমে যাওয়ায় হজম কমে, ফলে যে খাবারটা খেয়েছে তা থেকেও পুরো পুষ্টি মেলে না।
এজন্য গরমে শুধু খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে লাভ হয় না। বরং যতটা খাচ্ছে তার মধ্যেই যেন ভালো পুষ্টি থাকে, আর যে সময়টায় গরু খেতে পারে তখন যেন ভালো খাবার সামনে থাকে, এই দুটোই মূল কাজ।
খাওয়ানোর সময় ও নিয়ম বদলান
গরমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা খাবারে নয়, খাওয়ানোর সময়ে।
- দিনের সবচেয়ে ঠান্ডা সময়ে ভালো খাবার দিন: ভোরে আর সন্ধ্যার পরে। রাতে খেতে দিলে গরু ভালো খায়।
- দুপুরের কড়া রোদে ভারী দানাদার দেবেন না। হজমে শরীরে বাড়তি তাপ তৈরি হয়।
- মোট খাবার দুই বা তিন ভাগে ভাগ করে দিন, একবারে বেশি নয়।
- পাত্রে খাবার পড়ে থেকে গরম হয়ে যাওয়ার আগেই তুলে নিন। বাসি খাবার গরমে দ্রুত টক হয়।
- দুধের গাভী ১৫-২৫ কেজি সাইলেজ, মোটাতাজাকরণের গরু ১০-২০ কেজি, ছাগল-ভেড়া ১-২ কেজি, এই পরিমাণ গরমেও একই থাকে। শুধু সময় ভাগ করে দিন।
খাবারের ভাগ ও সময় গোয়ালের দেয়ালে লেখা থাকলে কাজের লোকও নিয়ম মানতে পারে। আমাদের ফ্রি খাদ্য তালিকা চার্ট প্রিন্ট করে টানিয়ে রাখতে পারেন।
পানি: গরমের সবচেয়ে জরুরি জিনিস
গরমে পানি খাবারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। গরুর পানির চাহিদা গরমে অনেক বেড়ে যায়, আর দুধের গাভীর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
- সবসময় পরিষ্কার পানি সামনে রাখুন। দিনে দুবেলা দেওয়ার নিয়মে গরমে চলে না।
- পানির পাত্র ছায়ায় রাখুন। রোদে রাখা পাত্রের পানি গরম হয়ে যায়, গরু তখন কম খায়।
- একটির বেশি পাত্র দিন, যেন দুর্বল গরুও ভিড়ে সুযোগ পায়।
- দোহনের পরপর পানি দিন, ওই সময় গাভী সবচেয়ে বেশি পানি খায়।
- পাত্র রোজ ধুয়ে দিন। গরমে পাত্রে শ্যাওলা আর জীবাণু দ্রুত জমে।
গোয়াল ও গরুকে ঠান্ডা রাখা
- দুপুরে (সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা) গরু ছায়ায় রাখুন, মাঠে চরাতে দেবেন না।
- ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। দুই পাশ খোলা, গুমোট নয়। ফ্যান থাকলে দুপুরে চালান।
- টিনের চালের নিচে গরম বেশি জমে। চালের উপরে খড় বা ছন দিলে ভেতরে তাপ কমে।
- দুপুরে গায়ে পানি ছিটিয়ে দিন বা ভিজিয়ে দিন, সঙ্গে বাতাস থাকলে ঠান্ডা হয় দ্রুত। তবে গোয়ালে যেন কাদা-পানি জমে না থাকে, নয়তো খুরের সমস্যা হয়।
- ঘরে ভিড় কমান। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাঁধা থাকলে তাপ বেরোতে পারে না।
গরমে সাইলেজ ব্যবহারের সতর্কতা
এই কথাটা সরাসরি বলি, কারণ না বললে খামারির টাকা নষ্ট হয়: গরমে খোলা সাইলেজ দ্রুত নষ্ট হয়। না-খোলা এয়ারটাইট বস্তা ৬-১২ মাস ভালো থাকে, কিন্তু বস্তা একবার খুললে হিসাব বদলে যায়। স্বাভাবিক নিয়ম ২-৩ দিন, তবে কড়া গরমে যত দ্রুত শেষ করতে পারেন তত ভালো।
- বস্তা রোদে ফেলে রাখবেন না, ছায়ায় ও ঠান্ডা জায়গায় রাখুন।
- প্রতিদিন যতটা লাগবে ততটাই বের করুন, বাড়তি বের করে রেখে দেবেন না।
- পাত্রে পড়ে থাকা সাইলেজ গরমে দ্রুত টক ও গরম হয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া অংশ ফেলে দিন, পরের বেলায় দেবেন না।
- খোলার পর গন্ধ ও রং দেখে নিন। সন্দেহ হলে নষ্ট সাইলেজ চেনার ৭টি লক্ষণ মিলিয়ে দেখুন, আর সংরক্ষণের পুরো নিয়ম আছে এই গাইডে।
নষ্ট বা টক হয়ে যাওয়া খাবার গরমে খাওয়ালে পেট ফাঁপা বা পাতলা পায়খানার ঝুঁকি বাড়ে, তাই এই নিয়মগুলো ছোট মনে হলেও ছাড় দেবেন না। পেট ফাঁপার লক্ষণ ও করণীয় জানতে এই গাইডটি দেখে রাখুন।
গরমের দৈনিক রুটিন, ছোট চেকলিস্ট
- ভোর: ভালো খাবারের বড় ভাগটা এখন দিন, পানির পাত্র ধুয়ে ভরে দিন।
- সকাল ১০টার আগে: গরু ছায়ায় ঢুকিয়ে দিন, বাতাসের ব্যবস্থা দেখুন।
- দুপুর: ভারী দানাদার নয়। পানি দেখুন, প্রয়োজনে গায়ে পানি দিন। কে হাঁপাচ্ছে খেয়াল করুন।
- বিকাল: পাত্রের বাসি খাবার সরিয়ে পরিষ্কার করুন।
- সন্ধ্যা ও রাত: দিনের দ্বিতীয় বড় ভাগ দিন, রাতে গরু ভালো খায়।
- প্রতিদিন: দুধের পরিমাণ লিখে রাখুন। হঠাৎ কমলে কারণ খুঁজতে সুবিধা হয়।
গরমের মাসগুলোতে খাবারের জোগান নিশ্চিত রাখাটাও পরিকল্পনার অংশ। খামারভেস্ট সাইলেজ ৫০ কেজির এয়ারটাইট বস্তায় (১০ টাকা কেজি, বস্তা ৫০০ টাকা) সারাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পৌঁছায়, তাই ঘাস কম থাকা মাসেও একই মানের সবুজ খাবার দিতে পারবেন। আপনার গরুর সংখ্যায় কত বস্তা লাগবে তা হোমপেজের ক্যালকুলেটরে দেখে নিতে পারেন। মৌসুম বদলের পুরো প্রস্তুতির জন্য বর্ষার ও শীতের গাইড দুটোও পড়ে রাখুন।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
মৌসুম অনুযায়ী খামার পরিচালনার পরামর্শ, সাইলেজ স্টক আপডেট ও খামারিদের অভিজ্ঞতা পেতে ফেসবুকে যুক্ত থাকুন।