খামারি গাইড · ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ওলান ফোলা রোগ (ম্যাস্টাইটিস): লক্ষণ ও প্রতিরোধ

ওলান ফুলে শক্ত হলে, দুধে ছানা বা রক্ত এলে সবাই বোঝেন গাভীর ম্যাস্টাইটিস হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক দুধের গাভীতে রোগটা থাকে চোখে কোনো লক্ষণ ছাড়াই, আর তখনও দুধ কমে। এই গাইডে দুই রকম ম্যাস্টাইটিস চেনা, ঘরে বসে পরীক্ষা, আর দোহনের সময় কী করলে নতুন সংক্রমণ কমে।

ভুট্টা খেত, খামারভেস্ট সাইলেজ

এক কথায় উত্তর

ম্যাস্টাইটিস হলো ওলানের প্রদাহ, প্রায় সবসময় জীবাণু থেকে। দৃশ্যমান রোগ (ফোলা, গরম, দুধে ছানা) অল্প গাভীতে হয়, কিন্তু লুকানো রোগ (সাবক্লিনিক্যাল) বাংলাদেশের গবেষণায় ২৯ থেকে ৫৫ শতাংশ গাভীতে পাওয়া গেছে। ধরতে লাগে সস্তা একটা ওলান পরীক্ষা। প্রতিরোধের মূল নিয়ম: শুকনা পরিষ্কার বাঁটে দোহন, প্রতি গাভীর আলাদা কাপড়, দোহনের পর বাঁট জীবাণুনাশকে ডোবানো, আক্রান্ত গাভী সবার শেষে দোহন। চিকিৎসা প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শে, আর অ্যান্টিবায়োটিকের পর নির্ধারিত সময় দুধ বিক্রি নয়।

১. ম্যাস্টাইটিস কী, আর দুই রকম কেন

MSD ভেটেরিনারি ম্যানুয়ালের সংজ্ঞায়, ম্যাস্টাইটিস হলো ওলানের এক বা একাধিক বাঁটের গ্রন্থির প্রদাহ, যার মূল কারণ ব্যাকটেরিয়া। প্রদাহে দুধ তৈরির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই দুধ কমে। রোগটা দুই রূপে আসে:

  • দৃশ্যমান (ক্লিনিক্যাল): ওলান বা একটা বাঁট ফোলা, শক্ত, গরম, ব্যথা; দুধে ছানা, দলা, পানির মতো পাতলা বা রক্তমেশা। কঠিন হলে গাভীর জ্বর, খাওয়া বন্ধ।
  • লুকানো (সাবক্লিনিক্যাল): ওলান আর দুধ দেখতে স্বাভাবিক, কিন্তু দুধে প্রদাহের কোষ বেশি, আর দুধের পরিমাণ চুপচাপ কমে। পরীক্ষা ছাড়া ধরা যায় না।

সমস্যা দ্বিতীয়টা নিয়েই: খামারি যে গাভীকে সুস্থ ভেবে দুইছেন, পরীক্ষায় তার অনেকগুলোতেই রোগ ধরা পড়ে, যেমন নিচের টেবিলে।

২. বাংলাদেশে কতটা

গবেষণা নমুনা লুকানো ম্যাস্টাইটিস (গাভী)
বাকৃবি খামার ও টাঙ্গাইল সদর (২০১১)২০০ দুধের নমুনা২৯% (CMT-তে ২৯.৫%)
সিরাজগঞ্জ, ৭২ খামার (বাকৃবি, ২০২৬)৩৮০ গাভী৪৫.৮% (CMT); তিন পরীক্ষার যেকোনোটায় ৫২.৪%
BLRI আঞ্চলিক কেন্দ্র, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা (২০১৮)৩০০ দুধের নমুনা, সংকর গাভী৫১%
শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ (২০২৫)১৫০ গাভী৫৫.৩%

একটা সতর্কতা: এগুলো খামারে করা দ্রুত পরীক্ষার ফল, ল্যাবের নিশ্চিত রোগনির্ণয় নয়, তাই প্রকৃত হার কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। তবু সব গবেষণার বার্তা এক: দেশের দুধ-অঞ্চলে লুকানো ম্যাস্টাইটিস ব্যতিক্রম নয়, সাধারণ ঘটনা।

৩. কোন গাভীর ঝুঁকি বেশি

শাহজাদপুরের গবেষণায় (২০২৫) লুকানো ম্যাস্টাইটিস বেশি পাওয়া গেছে এই গাভীগুলোতে:

  • সংকর জাত: ৫৯%, দেশি গাভীতে ৪০%।
  • বেশি দুধের গাভী: দিনে ১৬ লিটার বা বেশি দুধের গাভীতে ৬৯%।
  • বাচ্চা দেওয়ার পর প্রথম ২ মাস: ৫৯%।
  • বয়স্ক ও বেশি বাচ্চা দেওয়া গাভী: ৭ বছর বা বেশি বয়সে ৭২%; চতুর্থ বা পরের বাচ্চায় ৭০%, প্রথম বাচ্চায় ৪৫%।

অর্থাৎ খামারের সবচেয়ে দামি গাভীগুলোই সবচেয়ে ঝুঁকিতে। MSD ম্যানুয়াল আরও বলে, আবহাওয়া, ঋতু, বিছানা, গোয়ালে গাদাগাদি আর দোহনের পদ্ধতি রোগের হার বদলায়; বর্ষায় ভেজা স্যাঁতসেঁতে মেঝে তাই বাড়তি ঝুঁকি, যা নিয়ে বর্ষার গাইডে আছে।

৪. ঘরে বসে পরীক্ষা

লুকানো ম্যাস্টাইটিস ধরার জন্য বাঁট-প্রতি দুধ আলাদা করে একটা রিএজেন্টের সাথে মিশিয়ে দেখা হয়: দুধ জেলির মতো ঘন হলে প্রদাহের কোষ বেশি। সবচেয়ে প্রচলিত ক্যালিফোর্নিয়া ম্যাস্টাইটিস টেস্ট (CMT), যার কিট আর প্যাডেল পশু-ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়। BLRI-র সিরাজগঞ্জের গবেষণায় তিনটা পরীক্ষার মধ্যে সার্ফ ফিল্ড ম্যাস্টাইটিস টেস্ট (ডিটারজেন্ট দিয়ে) ছিল সবচেয়ে সস্তা ও সহজ। পদ্ধতিটা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে একবার হাতে-কলমে শিখে নিন।

কখন করবেন: মাসে একবার সব দুধের গাভীতে, আর যখনই কোনো গাভীর দুধ হঠাৎ কমে। দৃশ্যমান রোগে প্রতিদিন দোহনের আগে প্রথম দুই-তিন ফোঁটা দুধ একটা কালো পাত্রে বা কাপড়ে ফেলে দেখুন; ছানা বা দলা থাকলে সাথে সাথে ধরা পড়ে।

৫. দোহনের নিয়ম: যেখানে আসল প্রতিরোধ

কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয় আর যুক্তরাজ্যের AHDB-র নির্দেশিকা একই কথা বলে: সংক্রামক ম্যাস্টাইটিস ছড়ায় এক গাভী থেকে আরেক গাভীতে, দোহনের সময়, হাত আর কাপড়ের মাধ্যমে। তাই প্রতিরোধও দোহনেই:

  1. শুকনা, পরিষ্কার বাঁটে দোহন। হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন, সম্ভব হলে গ্লাভস পরুন। বাঁট ধুলে দোহনের আগে মুছে শুকান।
  2. প্রতি গাভীর আলাদা কাপড় বা কাগজ। এক কাপড়ে সব গাভীর ওলান মোছা মানে জীবাণু এক গাভী থেকে আরেক গাভীতে বয়ে নেওয়া।
  3. দোহনের পর বাঁট ডোবান। দোহনের ঠিক পরে প্রতিটি বাঁট পুরোটা জীবাণুনাশক দ্রবণে ডোবান। কেন্টাকির নির্দেশিকা অনুযায়ী এতে নতুন সংক্রমণ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে। কোন দ্রবণ নেবেন, প্রাণী চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন।
  4. আক্রান্ত গাভী সবার শেষে। যে গাভীর ম্যাস্টাইটিস আছে বা ছিল, তাকে আলাদা রাখুন আর সবার শেষে দোহন করুন, যাতে হাত থেকে জীবাণু সুস্থ গাভীতে না যায়।
  5. দোহনের পর গাভী দাঁড়িয়ে থাকুক। দোহনের পরপর বাঁটের মুখ কিছুক্ষণ খোলা থাকে। তখনই নাঁদে টাটকা খাবার দিন, যেমন খামারভেস্ট সাইলেজ বা কাঁচা ঘাস, যাতে গাভী খেতে দাঁড়িয়ে থাকে আর ভেজা মেঝেতে শুয়ে না পড়ে।
  6. শুকনা, পরিষ্কার মেঝে আর বিছানা। গোবর আর প্রস্রাব জমতে দেবেন না, ভেজা বিছানা বদলান।
  7. বারবার আক্রান্ত গাভী। চিকিৎসার পরও যে গাভী বারবার আক্রান্ত হয়, সে বাকিদের জন্য জীবাণুর উৎস; নির্দেশিকাগুলো এমন গাভী বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

৬. চিকিৎসা: যা নিজে করবেন না

এই গাইডে আমরা কোনো ওষুধের নাম বা মাত্রা লিখছি না, কারণ সঠিক ওষুধ নির্ভর করে কোন জীবাণু তার উপর। BLRI-র গবেষণায় সিরাজগঞ্জের নমুনার জীবাণু পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন আর কোলিস্টিনে প্রতিরোধী পাওয়া গেছে, অর্থাৎ দোকানের প্রচলিত ওষুধ কাজ না-ও করতে পারে। তিনটা নিয়ম মানুন:

  • দ্রুত প্রাণী চিকিৎসক। দৃশ্যমান লক্ষণ দেখলেই, বিশেষ করে গাভীর জ্বর বা খাওয়া বন্ধ হলে।
  • আক্রান্ত বাঁট পুরো খালি করুন, আর সেই দুধ বাছুরকে বা বিক্রিতে নয়।
  • অ্যান্টিবায়োটিকের পর অপেক্ষার সময়। চিকিৎসক বা ওষুধের মোড়কে যতদিন দুধ বিক্রি না করতে বলা আছে, ততদিন নয়। AHDB-র নির্দেশিকাও বলে চিকিৎসাধীন গাভীর দুধ মূল দুধে মেশাবেন না।

৭. খাবারের ভূমিকা কতটা

সৎভাবে বলি: ম্যাস্টাইটিস মূলত পরিচ্ছন্নতা আর দোহনের রোগ, খাবারের নয়। খামারভেস্ট সাইলেজ আমরা বিক্রি করি, কিন্তু কোনো খাবার ম্যাস্টাইটিস ঠেকায়, এমন দাবি আমরা করি না। খাবারের যে দুটো ভূমিকা আছে, দুটোই পরোক্ষ: খনিজ ও লবণের ঘাটতি না রাখা (খনিজের গাইড), আর শুকনা গাভী থেকে বাচ্চা দেওয়ার সময় পর্যন্ত ঠিকঠাক খাওয়ানো (গর্ভবতী ও শুকনা গাভীর গাইড), কারণ উপরের তথ্যেই দেখা যায় বাচ্চা দেওয়ার পরের দুই মাস সবচেয়ে ঝুঁকির সময়।

সাধারণ প্রশ্ন

গাভীর ওলান ফোলা রোগের লক্ষণ কী?

দৃশ্যমান রোগে ওলান বা একটা বাঁট ফোলা, শক্ত, গরম ও ব্যথা; দুধে ছানা, দলা, পানির মতো পাতলা বা রক্তমেশা দুধ; কঠিন হলে জ্বর ও খাওয়া বন্ধ। লুকানো রোগে কোনো লক্ষণ থাকে না, শুধু দুধ কমে, আর তা ধরা পড়ে CMT বা সার্ফ টেস্টের মতো পরীক্ষায়।

বাংলাদেশে কত গাভীর ম্যাস্টাইটিস থাকে?

টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার কয়েকটি গবেষণায় লুকানো (সাবক্লিনিক্যাল) ম্যাস্টাইটিস পাওয়া গেছে ২৯ থেকে ৫৫.৩ শতাংশ গাভীতে। এগুলো খামারের দ্রুত পরীক্ষার ফল, ল্যাবের নিশ্চিত রোগনির্ণয় নয়।

ম্যাস্টাইটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?

দোহনের পর প্রতিটি বাঁট জীবাণুনাশক দ্রবণে ডোবানো; কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী এতে নতুন সংক্রমণ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে। সাথে শুকনা পরিষ্কার বাঁটে দোহন, প্রতি গাভীর আলাদা কাপড়, আর আক্রান্ত গাভী সবার শেষে দোহন।

ম্যাস্টাইটিসের গাভীর দুধ কি বিক্রি করা যায়?

আক্রান্ত বাঁটের দুধ নয়। আর অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে চিকিৎসক বা ওষুধের মোড়কে যতদিন অপেক্ষা করতে বলা আছে, ততদিন সেই গাভীর দুধ বিক্রি বা মূল দুধে মেশানো যাবে না।

কোন গাভীর ম্যাস্টাইটিসের ঝুঁকি বেশি?

শাহজাদপুরের গবেষণায় সংকর জাত (৫৯%, দেশিতে ৪০%), দিনে ১৬ লিটার বা বেশি দুধের গাভী (৬৯%), বাচ্চা দেওয়ার পর প্রথম ২ মাস (৫৯%), আর ৭ বছর বা বেশি বয়সের গাভীতে (৭২%) হার বেশি ছিল।

তথ্যসূত্র

পরের ধাপ: সাইলেজ নিতে চাইলে

খামারভেস্ট সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা। আগে টাকা নয়, বস্তা হাতে পেয়ে টাকা; পরিবহন খরচ কনফার্মেশন কলে জানানো হয়।

সম্পর্কিত গাইড

সাইলেজ কেনার আগে

আপনার জেলায় সাইলেজ: দাম ও ডেলিভারি

জেলা বেছে নিন, সেখানে কীভাবে অর্ডার ও ডেলিভারি হয় দেখে নিন।

খামারভেস্ট সাইলেজ (Khamarvest Silage)

দোহনের পর নাঁদে টাটকা খাবার

ভুট্টা সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা, পণ্য হাতে পেয়ে টাকা। পরিবহন কনফার্মেশন কলে জানানো হয়, কোনো ন্যূনতম অর্ডার নেই।

WhatsApp-এ কথা বলুন

৮.৫০ টাকা কেজিহাতে পেয়ে টাকা

কল করুন WhatsApp-এ অর্ডার