প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করি: নেপিয়ার ঘাস খারাপ, এমন কথা এই লেখায় পাবেন না। জমি, সেচ আর শ্রম থাকলে নিজের চাষের নেপিয়ারই সবচেয়ে সস্তা সবুজ খাবার। প্রশ্নটা হলো, আপনার সেই তিনটা জিনিস আছে কি না, আর বছরের ১২ মাসই আছে কি না। এই দুই প্রশ্নের উত্তরেই ঠিক হয়ে যায় আপনি চাষ করবেন, কিনবেন, নাকি দুটোই করবেন।
নেপিয়ার ঘাস চাষে কী কী লাগে
নেপিয়ার লাগানো হয় কাটিং (কাণ্ডের টুকরা) থেকে। একবার লাগালে ঘাস বারবার কেটে খাওয়ানো যায়, এটাই নেপিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে চাষের আগে এই খরচগুলো হিসাবে ধরুন:
- জমি: নিজের জমি না থাকলে লিজ নিতে হবে, আর ধান বা সবজির জমি ঘাসে দিলে সেই ফসলের আয়টাও খরচের হিসাবে ধরতে হয়।
- সেচ: শুকনো মৌসুমে সেচ ছাড়া নেপিয়ার ভালো বাড়ে না। সেচের খরচ ও ব্যবস্থা আছে কি না দেখুন।
- সার ও পরিচর্যা: বারবার কাটা ঘাস মাটির পুষ্টি টানে, নিয়মিত সার না দিলে ফলন পড়ে যায়।
- শ্রম: প্রতিদিন বা একদিন পরপর কেটে আনার লোক লাগবেই, কারণ নেপিয়ার কেটে রাখা যায় না।
চাষের বিস্তারিত পরামর্শ (জাত, রোপণ দূরত্ব, সারের মাত্রা) আপনার উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে বিনামূল্যে পাবেন। তারা এলাকার মাটি অনুযায়ী সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন।
নেপিয়ারের তিনটা সীমাবদ্ধতা, যা কেউ আগে বলে না
- সংরক্ষণ করা যায় না: নেপিয়ার আজ কেটে আজই খাওয়াতে হয়। কেটে ফেলে রাখলে গরম হয়ে নষ্ট হয়। তাই ঘাস বেশি হলে সেই বাড়তিটা কাজে লাগে না, কম হলে কেনার পথ খুঁজতে হয়।
- শীতে বৃদ্ধি কমে যায়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ঠান্ডায় নেপিয়ার ধীরে বাড়ে। ঠিক যে সময় সবুজ খাবার সবচেয়ে দরকার, সেই সময়েই জোগান কমে।
- বয়স বাড়লে পুষ্টি কমে: কচি অবস্থায় না কেটে দেরি করলে কাণ্ড শক্ত হয়ে আঁশ বাড়ে, গরু কম খায় এবং হজমও কম হয়। সময়মতো কাটার নিয়ম না মানলে ফলনের বড় অংশ কাজে আসে না।
ভুট্টা সাইলেজ কোথায় আলাদা
সাইলেজ হলো দানাসহ আস্ত ভুট্টা গাছ সঠিক বয়সে কেটে, চপ করে, বাতাসহীন অবস্থায় ফার্মেন্ট করা খাবার। নেপিয়ারের সঙ্গে মূল পার্থক্য তিন জায়গায়:
- দানা থাকে: ভুট্টার দানা থাকায় শুধু পাতা-কাণ্ডের ঘাসের চেয়ে শক্তি বেশি, ফলে দামি দানাদারের ব্যবহার কিছুটা কমানো যায়।
- সংরক্ষণ করা যায়: খামারভেস্ট সাইলেজের ৫০ কেজির এয়ারটাইট বস্তা না খুললে ৬-১২ মাস ভালো থাকে। শীত-বর্ষার ঘাটতির মাসের খাবার আগেই ঘরে রাখা যায়।
- জমি-সেচ-শ্রম লাগে না: দাম দিলেই বাড়িতে পৌঁছে যায়। প্রতি কেজি ১০ টাকা, বস্তা ৫০০ টাকা, সারাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি।
সাইলেজ কীভাবে তৈরি হয় আর কেন নষ্ট হয় না, তার বিস্তারিত সাইলেজ কী গাইডে পাবেন। আর কাঁচা ঘাস, খড় ও সাইলেজের টাকার অঙ্কে তুলনা আছে এই তুলনা গাইডে।
কোনটা কখন বেছে নেবেন
নেপিয়ার চাষ করুন যদি
- নিজের বা সস্তায় লিজের জমি আছে, সেচের ব্যবস্থা আছে।
- প্রতিদিন ঘাস কাটার লোক বা নিজের সময় আছে।
- গরুর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জমিতে চাষ করতে পারবেন।
সাইলেজ কিনুন যদি
- জমি বা সেচ নেই, কিংবা শহর-উপশহরে অল্প জায়গায় খামার করছেন (এমন খামারের কৌশল এই গাইডে)।
- ঘাস কাটার লোকের খরচ ঘাসের সাশ্রয় খেয়ে ফেলছে।
- শীত বা বর্ষায় খাবারের টানাটানিতে প্রতি বছর ভুগছেন।
দুটো মিলিয়ে চালান যদি (বেশিরভাগ খামারির জন্য সেরা)
যাদের কিছু জমি আছে কিন্তু পুরো বছরের চাহিদা মেটে না, তাদের জন্য সবচেয়ে কাজের কৌশল: বর্ষা-গ্রীষ্মে নিজের নেপিয়ার খাওয়ান, আর শীতের ঘাটতির মাসগুলোর জন্য আগেই সাইলেজের বস্তা কিনে রাখুন। এতে সারা বছর সবুজ খাবার থাকে, অথচ খরচ থাকে সবচেয়ে কম। একই দিনে দুটো মিশিয়েও দেওয়া যায়, গরুর হজমে কোনো সমস্যা হয় না, শুধু নতুন খাবারে অভ্যাস করানোর সময় ৭ দিনের নিয়ম মানবেন।
আপনার গরুর সংখ্যা অনুযায়ী ঘাটতির মাসে কত বস্তা লাগবে, তা হোমপেজের ক্যালকুলেটরে এক মিনিটে হিসাব করতে পারবেন।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
ঘাস চাষ, সাইলেজ ও খামার পরিচালনার নিয়মিত পরামর্শ পেতে ফেসবুকে যুক্ত থাকুন।