
বাংলাদেশে গরু পালনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করা রোগগুলোর একটি ক্ষুরা রোগ, ইংরেজিতে Foot and Mouth Disease বা FMD। এটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, একটি খামারে ঢুকলে পুরো পালে এবং আশপাশের খামারেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাণঘাতী কম হলেও দুধ উৎপাদন ও ওজন বৃদ্ধিতে বড় ধাক্কা দেয়, আর বাছুরের ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
এই লেখা রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। উদ্দেশ্য একটাই, লক্ষণ তাড়াতাড়ি চেনা এবং সন্দেহ হলে দেরি না করে সঠিক জায়গায় জানানো, কারণ ক্ষুরা রোগে সময়ই সবচেয়ে বড় জিনিস।
জরুরি বিষয়
এটি চিকিৎসা পরামর্শ নয়। ক্ষুরা রোগ সন্দেহ হলে সন্দেহভাজন গরুকে সঙ্গে সঙ্গে বাকি পাল থেকে আলাদা করুন, হাটে নেবেন না বা বিক্রি করবেন না, এবং নিকটতম উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা পশুচিকিৎসককে জানান। নির্ণয়, ওষুধ ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত সবসময় তাঁদেরই।
যে লক্ষণে সন্দেহ করবেন
MSD পশুচিকিৎসা ম্যানুয়াল অনুযায়ী লক্ষণগুলো সাধারণত এই ধারায় আসে:
- ১. জ্বর: প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, গরু নেতিয়ে পড়ে ও খাওয়া কমিয়ে দেয়।
- ২. মুখে ফোস্কা: জিভ, মাড়ি, ঠোঁটের ভেতরে ও তালুতে ছোট ফোস্কা ওঠে। গরু মুখ দিয়ে লালা ফেলে এবং চটচটে শব্দ করে মুখ নাড়ে।
- ৩. পায়ে ফোস্কা ও খোঁড়ানো: খুরের ফাঁকে ও কিনারায় ফোস্কা ওঠে, গরু পা ঠোকে, শুয়ে থাকতে চায় এবং হাঁটতে কষ্ট পায়।
- ৪. দুধ ও ওজনে প্রভাব: খাওয়া কমে যাওয়ায় দুধ দ্রুত কমে যায়, দীর্ঘমেয়াদি আক্রান্ত গরুর দুধ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে WOAH-এর তথ্যে বলা হয়েছে।
মুখের ফোস্কা সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফেটে যায় এবং দুই সপ্তাহের কম সময়ে শুকিয়ে যায়, কিন্তু পায়ের ঘা শুকাতে বেশি সময় লাগে এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়ে দীর্ঘস্থায়ী খোঁড়ানো বা মৃত্যুও হতে পারে। ছোট বাছুরের ক্ষেত্রে আরেকটি বিপদ আছে: হৃদপেশিতে ভাইরাসের প্রভাবে কোনো আগাম লক্ষণ ছাড়াই বাছুর মারা যেতে পারে। তাই বাছুরের প্রতি বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
কেন এত দ্রুত ছড়ায়
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH)-এর তথ্য অনুযায়ী ক্ষুরা রোগ কয়েকভাবে ছড়ায়, আর প্রতিটিই সাধারণ খামারে ঘটার মতো:
- বাতাসে: আক্রান্ত গরু শ্বাসের সঙ্গে প্রচুর ভাইরাস ছাড়ে, যা কাছাকাছি অন্য গরু শ্বাসে বা মুখে টেনে নিতে পারে।
- সরাসরি সংস্পর্শে: লালা, দুধ ও বীর্যে ভাইরাস থাকে, লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রায় ৪ দিন আগে থেকেই।
- পরোক্ষভাবে: মানুষের জুতা, হাত, গাড়ির চাকা, খাবারের পাত্র, খড়-দানা এমনকি ভালোভাবে না রান্না করা মাংসের মাধ্যমেও ভাইরাস এক খামার থেকে আরেক খামারে পৌঁছাতে পারে।
- সেরে ওঠা গরুও ঝুঁকিমুক্ত নয়: কিছু গরু সুস্থ হওয়ার পরও গলায় ভাইরাস বহন করতে পারে এবং নতুন প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে কখন ঝুঁকি বেশি
২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারি নজরদারির তথ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় (PMC/NCBI, ৬৪ জেলার তথ্য বিশ্লেষণ) দেখা গেছে:
- বর্ষার পরের সময়ে বেশি: সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মিলিয়ে মোট আক্রান্তের প্রায় ৩১.৫ শতাংশ ঘটে, শুধু নভেম্বরেই প্রায় ১১.১ শতাংশ।
- কিছু এলাকায় বেশি: চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে তুলনামূলক বেশি প্রাদুর্ভাব পাওয়া গেছে।
এর মানে এই নয় যে অন্য মাসে বা অন্য জেলায় ঝুঁকি নেই, রোগ সারা বছর ও সারা দেশেই হতে পারে। শুধু এই সময় ও এলাকায় বাড়তি সতর্কতা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ, বিশেষ করে হাট থেকে নতুন গরু আনার আগে বা পরে।
ভ্যাকসিন কি সুরক্ষা দেয়
হ্যাঁ, তবে পুরোপুরি নয়। ভ্যাকসিন গরুকে অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করে, কিন্তু ভাইরাস গলায় থেকে যাওয়া পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না, তাই ভ্যাকসিন দেওয়া গরুও কখনো কখনো বাহক হতে পারে। একটি ডোজ কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়, তাই নিয়মিত বুস্টার জরুরি। বয়স অনুযায়ী কখন প্রথম ডোজ ও বুস্টার দিতে হয়, তার সাধারণ সময়সূচি আছে গরুর টিকা ও কৃমিনাশকের সময়সূচি লেখায়। কোন ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে এবং কখন দেওয়া উচিত, তা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত করে নিন।
অসুস্থ বা সেরে ওঠা গরুকে কী খাওয়াবেন
মুখের ভেতরে ফোস্কা ও ঘা থাকা অবস্থায় শুকনো খড় বা শক্ত ঘাস চিবানো গরুর জন্য যন্ত্রণাদায়ক, তাই স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া আরও কমে যায়। এই সময়ে সাহায্য করে এমন খাবার:
- নরম, সহজে গেলা যায় এমন আঁশজাতীয় খাবার। সাইলেজ কুচি করা ও নরম, তাই শুকনো খড়ের চেয়ে কম চিবিয়েই আঁশ ও পুষ্টি পাওয়া যায়। খামারভেস্ট সাইলেজের ৫০ কেজির বস্তা থেকে অল্প অল্প ভাগে দিন; নরম বলে মুখে ঘা থাকা গরুও সহজে খেতে পারে। এটি চিকিৎসা নয়, চিকিৎসা ভেটের পরামর্শে।
- ভেজানো বা নরম করা দানাদার, শুকনো ও শক্ত দানার বদলে।
- পরিষ্কার পানি সবসময় সামনে, কারণ মুখের ব্যথায় গরু কম পানি খেতে পারে এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে।
এটি চিকিৎসা নয়, শুধু খাওয়ানো সহজ করার উপায়। ওষুধ, ব্যথা কমানো বা সংক্রমণ ঠেকানোর সিদ্ধান্ত পশুচিকিৎসকের।
খামারে বায়োসিকিউরিটি: ঢোকার আগেই ঠেকান
WOAH-এর সুপারিশ অনুযায়ী এই অভ্যাসগুলো ঝুঁকি অনেকটাই কমায়:
- ✓নতুন কেনা গরু সরাসরি পালে না মিশিয়ে কিছুদিন আলাদা রাখুন এবং লক্ষণ আছে কি না দেখুন
- ✓বাইরের মানুষ ও যানবাহন গোয়ালে ঢোকার আগে জুতা ও চাকা ধুয়ে বা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন
- ✓খাবারের পাত্র, মাচা ও নালা নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন
- ✓হাট থেকে ফেরা গরু কিছুদিন পালের বাকি গরু থেকে দূরে রাখুন
- ✓অসুস্থ লক্ষণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সেই গরু আলাদা করুন, দেরি না করে
সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে কী করবেন
- ১. আলাদা করুন। সন্দেহভাজন গরুকে বাকি পাল থেকে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিন।
- ২. হাটে নেবেন না, বিক্রি করবেন না। এতে রোগ আরও ছড়ায় এবং অন্য খামারিরও ক্ষতি হয়।
- ৩. জানান। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা নিকটতম পশু হাসপাতালে খবর দিন। এটি দ্রুত ছড়ানো রোগ বলে দ্রুত জানানোই সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ।
- ৪. যত্ন চালিয়ে যান। নরম খাবার ও পরিষ্কার পানি দিন, পশুচিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন।
তথ্যসূত্র
সাধারণ প্রশ্ন
ক্ষুরা রোগের (FMD) প্রথম লক্ষণ কী কী?
প্রথমে জ্বর, প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর মুখের ভেতরে (জিভ, মাড়ি, ঠোঁটের ভেতরে) এবং পায়ের খুরের ফাঁকে ছোট ফোস্কা দেখা যায়। গরু মুখ দিয়ে লালা ফেলে, মুখ দিয়ে চটচটে শব্দ করে, পা মাটিতে ঠোকে এবং শুয়ে থাকতে চায়। খাওয়া কমে যায়, দুধ কমে যায় এবং কিছুদিনের মধ্যে খোঁড়ানো শুরু হয়। সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহভাজন গরু আলাদা করুন এবং প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা পশুচিকিৎসককে জানান।
ক্ষুরা রোগ কেন এত দ্রুত ছড়ায়?
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH)-এর তথ্য অনুযায়ী আক্রান্ত গরু শ্বাসের সঙ্গে প্রচুর ভাইরাস ছড়ায়, যা বাতাসেও ছড়াতে পারে। এছাড়া লালা, দুধ ও বীর্যের সরাসরি সংস্পর্শে, আর মানুষের জুতা, গাড়ির চাকা, খাবারের পাত্র বা খড়-দানার মাধ্যমেও পরোক্ষভাবে ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই আক্রান্ত গরু ভাইরাস ছড়াতে পারে। রোগ সেরে যাওয়া গরুও কখনো কখনো ভাইরাস বহন করে নতুন প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে কোন সময়ে ক্ষুরা রোগের ঝুঁকি বেশি?
২০১৪-২০১৭ সালের বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা এক গবেষণায় দেখা গেছে বর্ষার পরের সময়টায় (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) মোট আক্রান্তের প্রায় ৩১.৫ শতাংশ ঘটে, শুধু নভেম্বর মাসেই প্রায় ১১.১ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। এর মানে এই নয় যে অন্য সময় বা অন্য জেলায় ঝুঁকি নেই, শুধু এই সময়ে ও এলাকায় বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত বা সেরে ওঠা গরুকে কী খাওয়াবেন?
মুখের ভেতরের ফোস্কা ও ঘা শুকনো খড় বা শক্ত ঘাস চিবানো কষ্টকর করে তোলে, তাই এই সময়ে নরম, সহজে গেলা যায় এমন খাবার ভালো, যেমন সাইলেজ, নরম কাটা ঘাস বা ভেজানো দানাদার। পরিষ্কার পানি সবসময় সামনে রাখুন, কারণ মুখের ব্যথায় গরু কম পানি খেতে পারে। এটি কোনো চিকিৎসা নয়, শুধু খাওয়ানোর সহজ পথ। রোগ নির্ণয়, ওষুধ ও চিকিৎসা সবসময় পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে হতে হবে।
খামারভেস্ট Facebook পেজ
খামারের স্বাস্থ্য ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়মিত গাইড পেতে পেজে যুক্ত থাকুন।
পরের ধাপ: সাইলেজ নিতে চাইলে
খামারভেস্ট সাইলেজ ৮.৫০ টাকা কেজি, ৫০ কেজি বস্তা ৪২৫ টাকা। আগে টাকা নয়, বস্তা হাতে পেয়ে টাকা; পরিবহন খরচ কনফার্মেশন কলে জানানো হয়।
সম্পর্কিত গাইড
সাইলেজ কেনার আগে
আপনার জেলায় সাইলেজ: দাম ও ডেলিভারি
জেলা বেছে নিন, সেখানে কীভাবে অর্ডার ও ডেলিভারি হয় দেখে নিন।