সাইলেজের উপকার বুঝে ফেলার পর প্রায় প্রত্যেক খামারির মনেই একটা কথা আসে: "আমার তো জমি আছে, নিজেই বানিয়ে নিই না কেন? কেনার চেয়ে অনেক সস্তা পড়বে।"
প্রশ্নটা ন্যায্য, আর অনেকের জন্য উত্তরটা সত্যিই হ্যাঁ। কিন্তু হিসাবটা যতটা সহজ মনে হয় ততটা নয়, কারণ বেশিরভাগ মানুষ শুধু ভুট্টার দাম ধরেন, আর বাকি খরচগুলো চোখের আড়ালে থেকে যায়। নিচে পুরো হিসাবটা সাজানো হলো, সিদ্ধান্তটা আপনার।
কেন এখানে টাকার অঙ্ক লেখা নেই
জমি নিজের না বর্গা, এলাকায় মেশিন ভাড়া কত, শ্রমিকের মজুরি কত, এসব জেলা থেকে জেলায় এতটাই বদলায় যে একটা সংখ্যা লিখে দিলে সেটা বেশিরভাগ খামারির জন্যই ভুল হবে। তাই এখানে ঘরগুলো দেওয়া হলো, সংখ্যা আপনি বসাবেন। শুধু আমাদের নিজের দামটা জানা: খামারভেস্ট সাইলেজ প্রতি কেজি ১০ টাকা, ৫০ কেজির এয়ারটাইট বস্তা ৫০০ টাকা, বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। আপনার বের করা প্রতি কেজির খরচ এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।
নিজে বানাতে যে ৬টি জিনিস লাগবেই
এর যেকোনো একটি না থাকলে ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়:
- ১. জমি: ভুট্টা চাষের জন্য জমি, যেটি ওই মৌসুমে অন্য ফসলে ব্যবহার করা যাবে না।
- ২. সঠিক সময়ে কাটার জ্ঞান: ভুট্টা খুব কাঁচা অবস্থায় কাটলে পানি বেশি থাকে ও পুষ্টি কম হয়, আবার বেশি পেকে গেলে গাছ শুকনা হয়ে যায় ও ঠিকমতো চাপ বসে না। এই একটি সিদ্ধান্তই পুরো ব্যাচের মান ঠিক করে দেয়।
- ৩. চপার মেশিন: আস্ত গাছ ছোট টুকরায় কাটতে হয়। কেনা বা ভাড়া, দুটোই খরচ। দা দিয়ে কেটে ভালো সাইলেজ হয় না, কারণ বড় টুকরায় বাতাস আটকে থাকে।
- ৪. যথেষ্ট শ্রমিক, অল্প সময়ে: কাটা, চপ করা, ভরা ও সিল করা, পুরোটা এক থেকে দুই দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়। কাজ টেনে লম্বা করলে বাতাস ঢুকে যায়।
- ৫. বাতাসহীন সংরক্ষণ: এয়ারটাইট বস্তা, পিট বা ড্রাম। সিল ঠিক না হলে ফার্মেন্টেশনই হবে না, পচন হবে।
- ৬. চেপে বসানোর শৃঙ্খলা: ভেতরের বাতাস যত বেশি বের করা যায়, সাইলেজ তত ভালো হয়। এখানেই বেশিরভাগ প্রথমবারের ব্যাচ মার খায়।
খরচের যে ৭টি ঘর যোগ করতে হবে
কাগজে এই সাতটি ঘর লিখুন, নিজের এলাকার সংখ্যা বসান, তারপর মোট টাকাকে মোট কেজি দিয়ে ভাগ করুন। যা আসবে সেটাই আপনার নিজের বানানো সাইলেজের আসল দাম, প্রতি কেজিতে।
| খরচের ঘর | যা ধরতে হবে |
|---|---|
| ১. জমি | বর্গা হলে ভাড়া, নিজের হলে ওই জমিতে অন্য ফসল করলে যা আয় হতো |
| ২. বীজ, সার ও সেচ | পুরো মৌসুমের চাষের খরচ |
| ৩. চপার মেশিন | ভাড়া, অথবা কিনলে দাম ভাগ করে বছরপ্রতি খরচ, সঙ্গে তেল ও মেরামত |
| ৪. শ্রমিক | কাটা, বহন, চপ, ভরা ও সিল করার দিনমজুরি, নিজের শ্রমও ধরুন |
| ৫. সংরক্ষণের জিনিস | বস্তা, পলিথিন, পিট বানানোর খরচ |
| ৬. পরিবহন | জমি থেকে খামারে আনা |
| ৭. নষ্ট হওয়া অংশ | উপরের ও কিনারার যে অংশ ফেলে দিতে হয়, সেটিও টাকা |
যে খরচগুলো প্রায় সবাই ভুলে যায়
- জমির সুযোগ-খরচ: নিজের জমি বলে সেটি ফ্রি নয়। ওই জমিতে ধান বা সবজি করলে যা আয় হতো, সেটাও সাইলেজের খরচের অংশ।
- নিজের সময়: কাটা ও ভরার দিনগুলোতে আপনি খামারের অন্য কাজ করতে পারবেন না।
- শুধু মৌসুমে পাওয়া: নিজে বানালে বছরে এক বা দুইবার, ভুট্টার মৌসুমে। মজুদ ফুরালে বাকি সময় আবার কিনতেই হবে।
- সংরক্ষণের ক্ষতি: সিল ভালো না হলে উপরের স্তর নষ্ট হয়, আর সেটি প্রায়ই ১০ ভাগের বেশি হতে পারে। এই ক্ষতিও প্রতি কেজির দাম বাড়িয়ে দেয়।
আসল কথা হলো পরিমাণ
এখানেই পুরো সিদ্ধান্তের চাবি। উপরের খরচগুলোর মধ্যে কয়েকটি, বিশেষ করে মেশিন ভাড়া আর শ্রমিক জোগাড় করা, প্রায় একই থাকে আপনি ২ টন বানান বা ২০ টন। মেশিন একদিনের জন্য আনতে যত খরচ, অল্প কাজ করালেও প্রায় ততটাই।
ফল যা দাঁড়ায়: পরিমাণ যত বাড়ে, এই স্থির খরচগুলো তত বেশি কেজির মধ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং প্রতি কেজির দাম কমতে থাকে। উল্টোভাবে, অল্প কয়েকটি গরুর জন্য অল্প সাইলেজ বানালে একই স্থির খরচ অল্প কেজির ঘাড়ে চাপে, আর প্রতি কেজির দাম কেনা দামকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তাই "নিজে বানানো সস্তা" কথাটা শর্তসাপেক্ষে সত্যি: যথেষ্ট বড় পরিমাণে বানালে সস্তা। কত পশু হলে সেই সীমা পার হয়, তা আপনার জমি, মেশিনের সুবিধা ও মজুরির ওপর নির্ভর করে, আর সেটা উপরের সাতটি ঘর ভরলেই বেরিয়ে আসবে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: ব্যাচ নষ্ট হওয়া
খরচের হিসাবের বাইরে একটা ঝুঁকি আছে যেটি টাকায় মাপা কঠিন। বাতাস ঢুকলে বা ভুল সময়ে কাটলে ফার্মেন্টেশন ঠিকমতো হয় না, আর নষ্ট সাইলেজ গরুকে খাওয়ানো নিরাপদ নয়। তখন শুধু টাকা যায় না, পুরো মৌসুমের খাদ্য পরিকল্পনাটাই ভেঙে পড়ে, আর তড়িঘড়ি করে চড়া দামে খাবার জোগাড় করতে হয়।
প্রথমবার বানানোর সময় এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কারণ কাটার সময়, চপের আকার আর চাপ বসানো, তিনটিই অভিজ্ঞতার কাজ। কিনলে এই ঝুঁকিটা আপনার ঘাড় থেকে সরে যায়, আর বস্তা খুলে দেখে নিয়ে তবেই টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকে। কী দেখে মান যাচাই করবেন তা আছে সাইলেজের মান যাচাইয়ের ৬টি পরীক্ষায়।
কখন নিজে বানানোই ভালো সিদ্ধান্ত
- ✓আপনার নিজের জমি আছে এবং সেখানে এমনিতেই ভুট্টা হয়
- ✓পশুর সংখ্যা যথেষ্ট, তাই একবারে বড় পরিমাণ বানানো যায়
- ✓এলাকায় চপার মেশিন সহজে ও সময়মতো পাওয়া যায়
- ✓কাটার দুই দিনে শ্রমিক জোগাড় করার সামর্থ্য আছে
- ✓একটি ব্যাচ নষ্ট হলেও খামার সামলে নিতে পারবে
কখন কিনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ
- ✓জমি নেই, অথবা জমিতে ধান বা সবজি করলে বেশি আয় হয়
- ✓পশু কম, তাই সামান্য পরিমাণে বানালে প্রতি কেজির খরচ বেড়ে যায়
- ✓মেশিন বা শ্রমিক সময়মতো পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে
- ✓সারা বছর একই মানের খাবার দরকার, শুধু মৌসুমে নয়
- ✓খরচ আগে থেকে নিশ্চিত জানা দরকার, আর ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না
মাঝামাঝি পথটাই বেশিরভাগের জন্য ভালো
দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতেই হবে, এমন নয়। বাস্তবে অনেক খামারি যা করেন: মৌসুমে নিজে যতটা পারেন বানিয়ে রাখেন, আর মজুদ ফুরালে বা মান খারাপ হলে বাকিটা কিনে নেন। এতে খাবারের ধারাবাহিকতা ভাঙে না, আর পুরো ঝুঁকিও এক জায়গায় জমা হয় না।
প্রথমবারের জন্য আরও নিরাপদ পথ আছে: এই বছর খামারভেস্ট সাইলেজ কিনে গরুকে অভ্যস্ত করুন এবং দেখে নিন ভালো সাইলেজ আসলে দেখতে, শুঁকতে ও ধরতে কেমন। পরের মৌসুমে ছোট একটা ব্যাচ নিজে বানিয়ে মিলিয়ে দেখুন। তুলনা করার মতো একটা নমুনা হাতে না থাকলে নিজের বানানো ব্যাচ ভালো হয়েছে কি না সেটাই বোঝা কঠিন।
তথ্যসূত্র
খামারভেস্ট Facebook পেজ
সাইলেজ তৈরির ভিডিও, স্টক আপডেট ও খামারিদের অভিজ্ঞতা দেখতে ফেসবুকে যুক্ত হন।